রয়টারস সংস্থার খবর অনুযায়ী আফগানিস্তানের তালিবরা ভারতের আফগানিস্তান সংক্রান্ত অবস্থানকে খুবই উচ্চ মূল্যায়ন করেছে – অংশতঃ ভারতের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে একেবারেই হস্তক্ষেপ না করার প্রবল ইচ্ছা. কয়েকদিন আগেই দিল্লী সফরের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেত্তা আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারতের অংশগ্রহণ সক্রিয় করা নিয়ে আহ্বান করেছিলেন.

তালিবরা ভারতের অবস্থানের প্রতি স্রেফ সমর্থন করেই ক্ষান্ত হয় নি. তারা আরও দূরে অগ্রবর্তী হয়েছে, এই ঘোষণা করে যে, তারা কোন রকম ভাবেই আফগানিস্তানকে ঘাঁটি করে অন্য কোনও দেশের উপরে আক্রমণের পরিস্থিতি হতে দেবে না. ঠিক কোন দেশের কথা – তা অবশ্য স্পষ্ট করে বলা হয় নি. কিন্তু বিশ্লেষকরা এই ঘোষণাকে শুধু একটি অর্থেই বুঝেছেন: তা করা হয়েছে ভারতের আশঙ্কা দূর করার জন্য যে, তালিবরা ক্ষমতায় আসার পরে পাকিস্তানের সরকার তাদের ব্যবহার করতে পারে ভারতের উপরে চাপ বাড়ানোর একটা হাতিয়ার হিসাবে. এই পুরো ঘটনা পরম্পরাতেই অনেক প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশ্লেষক বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“খুব একটা বুঝতে পারা যায় নি, এই ঘোষণা তালিবান আন্দোলনের অবস্থান নিয়ে সরকারি ঘোষণা, নাকি সংবাদ মাধ্যমে “ছেড়ে দেওয়া” হয়েছে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারার জন্য. তাছাড়া, তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পর থেকে বিগত কয়েক বছরে একটা মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি থেকে পরিণত হয়েছে এক বহু সংখ্যক আলাদা গোষ্ঠীর যৌগে, যারা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে আলোচনা না করেই কাজকর্ম করে থাকে ও অনেক সময়ে একেবারেই পরস্পর বিরোধী লক্ষ্য নিয়ে চলে.

তা স্বত্ত্বেও, এই ঘোষণা এখনই উদয় হওয়ার কারণ হিসাবে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে ন্যাটো জোটের প্রধান শক্তি আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পরের নিয়ন্ত্রণের মডেল তৈরী করার ও খুঁজছে, কার উপরে প্রধান দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, খুবই প্রতীকী মনে করা যেতে পারে. ভারতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের পরিকল্পনায় একটা বিশেষ জায়গা দিতে চাইছে – এশিয়াতে সামগ্রিক ভাবে ও অংশতঃ ভাবে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে”.

১৯৯০ সালের দিকে ভারত ছিল সেই সমস্ত দেশের একটি, যারা তালিবদের বিরুদ্ধে একেবারেই শান্তির অযোগ্য অবস্থান নিয়ে ছিল, আর আফগানিস্তানে নির্ভর করেছিল একেবারেই অন্য শক্তির উপরে. কারণ ছিল যেমন, ভারতের এই এলাকায় বহু দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে তালিবদের ঘনিষ্ঠতা, তেমনই কাশ্মীরের ভারত বিরোধী কাজে পুস্তুন জঙ্গীদের (অর্থাত্ সেই সমস্ত গোষ্ঠী, যারা সরাসরি ভাবে তালিবদের সঙ্গেই যুক্ত ছিল) সক্রিয় অংশ গ্রহণ. কিন্তু সময় পাল্টেছে, আর তাই দেখে ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আজ ভারতের জন্য, আফগানিস্তানের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ গুলির মতই, খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রাথমিক ভাবে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি দেওয়া ও তার চারপাশে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরী করা. দ্বিতীয়তঃ, মাদক উত্পাদনের পরিমান বহুলাংশে কম করাতে বাধ্য করা ও সেখান থেকে মাদক পাচারের পথ বন্ধ করা. তৃতীয়তঃ – আফগানিস্তানের মাটিকে বিদেশী শক্তির জন্য সামরিক শক্তির ঘাঁটি হতে না দেওয়া, যাতে সামরিক – রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয় ও সম্ভবতঃ, সরাসরি ভাবে সামরিক আক্রমণ, যাতে তার প্রতিবেশী দেশ গুলিতে শুরু না হয় (তার মধ্যে যেমন ভারত, তেমনই ইরান, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশ গুলি রয়েছে). আর সর্বশেষ, চতুর্থতঃ – আফগানিস্তানকে চরমপন্থী ঐস্লামিক ধারণা তৈরীর বীজতলা হতে না দেওয়া”.

যদি কিছুদিন আগের ইতিহাস মনে করা হয়, তবে খুব সহজেই লক্ষ্য করা সম্ভব হবে যে, চারটির মধ্যে প্রথম তিনটি সম্ভব করা শুধু আফগানিস্তানে একটি শক্তির পক্ষেই সম্ভব – এরা তালিবরা, তাই বরিস ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

“তাদের শাসন কালেই নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয় ভাগে এই দেশে একটা তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীলতা তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল (কোন মূল্য – এটা অন্য প্রশ্ন). তারাই ২০০০- ২০০১ সালে আফিম গোত্রের ফসলের চাষ ও মাদক উত্পাদন কমিয়ে দিয়েছিল অনেকখানি (যা বিদেশী অনুপ্রবেশের পরে শুধু তালিব পূর্ব মাত্রাতেই ফিরে আসে নি, বরং তা অনেক গুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে. আর সর্বশেষ, খুবই কঠিন হবে ধারণা করা যে, তালিবরা আফগানিস্তানের এলাকায় বিদেশী সামরিক ঘাঁটি হতে দেবে (আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে, যতই তারা এটাকে অস্বীকার করতে চাক না কেন)”.

আর বাকি রইল চতুর্থ ধারণা – দেশকে চরমপন্থী ঐস্লামিক কাজকর্মের বীজতলা হতে না দেওয়া. দেখা যাচ্ছে যে, এখানেই তালিবদের ঘোষণার অর্থ লুকিয়ে রয়েছে, যে, তারা আফগানিস্তানকে অন্য কোনও দেশের উপরে আক্রমণের ঘাঁটি হতে দেবে না. এই ঘোষণাকে কতটা বিশ্বাস করা যেতে পারে – এটা এখন বলা সম্ভব নয়. কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে: আজকের দিনের তালিবরা অনেকটাই সেই সমস্ত খেপে যাওয়া চরমপন্থীদের থেকে আলাদা, যা তারা ছিল গত শতকের নব্বইয়ের দশকে. আর এর অর্থ হল যে, তালিবান আন্দোলনের তরফ থেকে করা ঘোষণার অর্থ হল আগের প্রতিদ্বন্দ্বীকে পারস্পরিক ভাবে লাভজনক আলোচনায় অংশ নিতে আহ্বান করা, এই রকমই তো মনে করেছেন রাশিয়ার এই বিশেষজ্ঞ.