এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনে তৃতীয় বাত্সরিক ভারত – মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক আলোচনা স্পষ্ট করেই দেখিয়ে দিয়েছে যেমন আংশিক ভাবে দুই দেশের স্বার্থের বিষয়ে সম্মতি, তেমনই অবস্থানের বিষয়ে দুই দেশের যথেষ্ট পার্থক্য, এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি তাঁর মত ব্যক্ত করেছেন.

অর্থনৈতিক দিকে দুই পক্ষেরই প্রশংসনীয় সাফল্য রয়েছে বলে রুশ বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন. গত দশ বছরে পারস্পরিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে পাঁচ গুণ: ২০০১ সালে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার সমান অর্থ মূল্যের থেকে, এই বছরে আশা অনুযায়ী হলে ১০ হাজার কোটি ডলারের সমান. দুই দেশের মধ্যে সামরিক- প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতার বৃদ্ধি হয়েছে: এই ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের. কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিজেদের শর্ত আরোপের চেষ্টা, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ওয়াশিংটন সক্রিয়ভাবে ভারতের খুচরো বিক্রয়ের বাজার আমেরিকার বৃহত্ বিক্রয় নেটওয়ার্ক গুলির জন্য খুলে দেওয়া দাবী করেছে. আমেরিকার যুক্তিতে বড় সুপার মার্কেট তৈরী হলে জিনিসের দাম কমবে ও তা ভারতের সাধারন ক্রেতাদের জন্য ভালই হবে. আর তার ফলে যে, দেশে বৃহত্ বিক্রয় নেটওয়ার্কের আগমনে বহু লক্ষ খুচরো ব্যবসায়ী দেউলে হয়ে যাবে, আর তার ফলেই দেশে সামাজিক সংঘর্ষের উদয় হবে, - আর তাও বর্তমানে, যখন, ভারতের অর্থনীতির মোটেও ভাল সময় যাচ্ছে না, - তা কিন্তু আমেরিকার লোকদের উদ্বিগ্ন করে না”.

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হয়েছে পারমানবিক শক্তির বিষয়ে সহযোগিতা. যখন বিগত বছর গুলিতে জর্জ বুশ জুনিয়র রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতবর্ষ পারমানবিক চুক্তি করেছিল, তখন মনে হয়েছিল যে, এবারে ভারতের বাজার আমেরিকার কোম্পানীদের জন্য খোলা. কিন্তু সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভারতের নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও রকমের স্বার্থহানী না করার ইচ্ছা, যা প্রকাশ পেয়েছিল পারমানবিক ক্ষতি সংক্রান্ত দায়িত্বের আইনে. ফলে, আমেরিকার ব্যক্তিগত মালিকানার কোম্পানী গুলির পক্ষে সরকারি সাহায্যে তৈরী অথবা সরকারি কর্পোরেশন গুলি, যা রাশিয়া বা ফ্রান্সের আছে, তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছিল না, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই বাজারে নিজেদের অবস্থান হারিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরীক্ষিত কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল: আমেরিকার তহবিলের টাকাতেই তৈরী হয়েছিল সেই সব সংস্থা, যারা ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে মহারাষ্ট্রে, যেখানে ফরাসী আরেভা কোম্পানী জৈতাপুর পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করতে গিয়েছিল ও তামিলনাডু রাজ্যে – যেখানে রুশ সহায়তায় কুদানকুলাম বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী হয়ে গিয়েছে, সেখানে গণ বিক্ষোভের ও বিদ্রোহের আয়োজন করেছিল. আর এখানে ব্যাপারটা মোটেও নিরাপত্তা প্রসঙ্গ নিয়ে নয়, বা পরিবেশ নিয়েও নয়. কয়েকদিন আগে গুজরাটে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী শুরু করা নিয়ে আমেরিকা- ভারতের চুক্তি সমস্ত প্রশ্নেরই অবসান করেছে ও স্পষ্ট করে দিয়েছে এই সব বিরোধের আসল স্বরূপ: এই সবই করা হয়েছিল প্রথম থেকে এই জন্যেই, যাতে আমেরিকার কোম্পানী গুলির প্রতিযোগীদের এই বাজার থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব হয়”.

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে বলতে হয়, তবে আমেরিকার কূটনীতিজ্ঞদের বর্তমানের কাজ হল ভারতকে তাদের দেশের এশিয়া সংক্রান্ত রাজনীতির প্রধান পরিবাহক দেশে পরিণত করার প্রচেষ্টা. এই প্রসঙ্গে ওয়াশিংটন একটানা ভারত পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ ও অন্য দিকে ভারত ও চিনের মধ্যে বিরোধ নিয়ে খেলা করে যাচ্ছে. অন্য কোন ভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় আফগানিস্তানে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারতের ভূমিকা বৃদ্ধি করার জন্য আমেরিকার পক্ষ থেকে আহ্বান, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনী অপসারণের পরে একটা ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি হতে পারে, যা এখনই ভর্তি করতে তৈরী আছে চিন ও পাকিস্তান. চিন তাদের বহু হাজার কোটি বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয় দেখিয়ে ও পাকিস্তান তাদের এই দেশের সঙ্গে ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রভাবশালী সম্পর্কের দোহাই দিয়ে, যা আফগানিস্তানের ভিতরেই একটি শক্তিশালী জোট তৈরী করতে সক্ষম, আর তাদের মধ্যে তালিবরাও থাকতে পারে আর তারা এই দেশকে এশিয়ার কেন্দ্রে নিজেদের ভরসা যোগ্য ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করতে পারে. এটা আমেরিকার জন্য লাভজনক নয়, আর এই নিজেদের সমস্যার সমাধানের জন্যই তারা সক্রিয়ভাবে ভারতকে দলে টানছে.

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির সঙ্গে ভারতের আফগানিস্তান সংক্রান্ত নীতির মূলগত প্রভেদ. ওয়াশিংটনের জন্য আফগানিস্তান প্রয়োজন প্রাথমিক ভাবে ইরানের উপরে চাপ সৃষ্টি করা ও নিজেদের মধ্য এশিয়াতে প্রভাব বিস্তার করার একটা প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসাবে.

ভারতের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ একেবারেই অন্য ধরনের: ভারতের প্রয়োজন স্থিতিশীল আফগানিস্তান ও ইরানের চারদিকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যাতে মধ্য এশিয়ার দেশ গুলির সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে ও রাশিয়া এবং উত্তর ইউরোপে বাণিজ্যের সুবিধার্থে “উত্তর – দক্ষিণের” পথ খুলে দেওয়া সম্ভব হয়. আর তাছাড়া খুবই সরল আশা হয়ে দাঁড়াবে আফগানিস্তানকে অথবা তার চারপাশ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনও রকমের সামরিক ভাবে অংশ গ্রহণ করানোর প্রচেষ্টা”.

এমনকি ভারতবর্ষ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের আংশিক সম্মতি থাকলেও ভারতের কাছ থেকে আশা করা যে, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব অন্যের রাজনৈতিক স্বার্থের বাস্তবায়নের জন্য জলাঞ্জলি দেবে, তা নিতান্তই বাতুলতা, এই রকমেরই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.