রক্তদানকরী প্রত্যেকে- বীর. এই শ্লোগান নিয়ে এ বছরে রক্তদানকারীদের আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হচ্ছে. এর পত্তন করা হয়েছিল ২০০৫ সালের মে মাসে ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের ৫৮ তম অধিবেশনে এবং তখন থেকে প্রত্যেক বছর ১৪ই জুন ঐ দিবস পালন করা হয়.

দিনটি এমনি এমনি বাছা হয়নি. এই দিনে অষ্ট্রিয়ার চিকিত্সক কার্ল ল্যান্ডস্টাইনারের জন্ম হয়েছিল ১৯৩০ সালে, যিনি মানুষের ব্লাড গ্রুপ নির্দ্ধারণ করার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন. এর সুবাদে ব্লাড ট্রান্সফিউশনের মাধ্যমে বহু রোগ সারানো সম্ভব হয়েছে. সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে মানুষের এ রকম ব্লাড ট্রান্সফিউশনের প্রয়োজন হয়. রক্তের প্রয়োজন হয় মানুষের দাহক্ষত থেকে, আঘাত থেকে, কখনো কখনো জটিল গর্ভপাতের পরে, জটিল অপারেশনের পরে. আর অ্যানিমিয়া ও হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রূগীদের সারাজীবন ধরে রক্তের দরকার হয়. হেমাটোলজিক্যাল বৈজ্ঞানিক কেন্দ্রের উপাধ্যক্ষ মিখাইল আলেকসানিয়ানের মতে পৃথিবীর অন্ততঃ এক-তৃতীয়াংশ মানুষের কমপক্ষে জীবনে একবার রক্তের প্রয়োজন হয়.

যদি রক্তদাতার ঘাটতি হয়, অথবা রক্তের প্রয়োজনীয় কম্পোনেন্ট না পাওয়া যায়, তাহলে বহু রোগ সারানো অসম্ভব. সেই কারণেই পৃথিবীর সর্বত্র রক্তদাতা ছাড়া চিকিত্সা বেঁচে থাকতে পারে না. বছরে একবার আমেরিকার রাষ্ট্রপতিরা রক্তদান করে, এবং সেটা দেশের সব দূরদর্শন চ্যানেল সম্প্রচারণ করে. আমরাও একই কাজ করি, এবং সবাইকে জানাই, যে এটা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর নয়, এটা মানবিক উদ্যোগ, যাতে লোকে বুঝতে পারে, যে এটা তাদের সামাজিক কর্তব্য.

গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে সারা বিশ্বে রক্তদান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে. সোভিয়েত ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি রক্তদান করা হতো. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাকি ৫০ লক্ষ লোক রক্তদান করেছিল, যার সুবাদে ৭০ লক্ষ জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল. তখনই ‘সম্মানজনক রক্তদাতা’র বিশেষ পদক তৈরি করা হয়, যারা ১০ বারের বেশি রক্তদান করেছে. ৯০-এর দশকে রক্তদাতাদের সংখ্যা অনেক কমে গেছিল. তবে ২০০৮ সালে চালু হওয়া রাষ্ট্রীয় ব্লাড সার্ভিসের কল্যানে এখন পরিস্থিতির অনেক উন্নতি ঘটেছে. ‘জীবন উপহার দাও’ নামক প্রখ্যাত সংস্থার ভাইস-ডিরেক্টর মারিয়া ইয়াব্লনতসেভা বলছেন, যে প্রত্যেক ১ হাজার মানুষের মধ্যে ২৪ জন রক্তদাতা থাকা অপরিহার্য.

এখন আমরা রাস্তাঘাটে প্ল্যাকার্ড দেখতে পাই, দূরদর্শনে অনুষ্ঠাণ দেখি এই সম্পর্কে, যে রক্তদান বাস্তবিকই কারও জীবন বাঁচাতে পারে. লোকে পড়ে, দ্যাখে ও অনেক যুবক-যুবতীরা রক্তদান করতে যায়. আর এক-দুবার রক্ত দেবার পরে নিয়মিত রক্ত দিতে শুরু করে.

এখন সারা বিশ্ব কৃত্রিম রক্ত আবিস্কারে ব্যস্ত, যা স্বাভাবিক রক্তের বিকল্প হতে পারবে. জার্মানীর ফার্মাসিস্টরা গরুর রক্ত থেকে কৃত্রিম হিমোগ্লোবিন বানিয়েছে. জাপানীরা রক্ত বানিয়েছে প্রোটীন দিয়ে. রাশিয়ায় সম্ভব হয়েছে রক্তের কোষ তৈরি করা, ইনঅরগ্যানিক তেজস্ক্রিয়তার মাধ্যমে. তবে এই সব কৃত্রিম রক্ত অক্সিজেন বহন করতে পারে, কিন্তু রক্তের অন্যান্য কর্তব্য মেটাতে পারে না. সুতরাং রক্তদাতাদের ছাড়া এখনো মানব সমাজ বাঁচতে পারবে না.

‘দাতা’ শব্দটা লাতিন ‘দোনারে’ থেকে উদ্ভুত. লোকে, যারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করে, তারা সবচেয়ে বড় উপহার দেয় – জীবন.