সিয়াচেন সমস্যা ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এক হোঁচট খাওয়ার জায়গা হয়েই রয়েছে. ইসলামাবাদে আরও এক রাউন্ড ভারত- পাকিস্তান আলোচনার পরেও এই হিমবাহ এলাকাকে সামরিক বাহিনী মুক্ত করার প্রশ্ন উত্তর বিহীণ থেকে গেল. অথচ এই বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল তিরিশ বছর আগে, বলা যেতে পারে, একটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব থেকেই, - মনে করেছেন আমাদের সমীক্ষক ভ্লাদিমির ইভাশিন.

 ১৯৭২ সালে কাশ্মীরে অগ্নি সম্বরণ সীমান্ত রেখা নিয়ে সিমলা চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে সেই প্রশ্ন যে, কে এই সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, এমনকি স্পর্শ করেও দেখা হয় নি. দিলে বলা হয়েছিল যে, মানচিত্রে NJ9842 বিন্দু থেকে “সীমান্ত উত্তরের দিকে এর পরে হিমবাহ অবধি” যাবে. আর বহু বছর ধরেই এই সংজ্ঞা ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশকেই সন্তুষ্ট রাখতে সক্ষম হয়েছিল.

 কিন্তু যখন ১৯৮৪ সালে জানা গিয়েছিল যে, এক দল জাপানী পর্বতারোহী, যারা সিয়াচেন থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রিমো নামের শৃঙ্গে আরোহণ করার পরিকল্পনা করেছেন ও তাদের এই জায়গায় পাকিস্তানের সেনারা পথ প্রদর্শন করবেন, তখন ভারত পাকিস্তানকে সন্দেহ করেছিল যে, তারা হিমবাহের উপরে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে. আর তখনই শুরু করা হয়েছিল অপারেশন “মেঘদূত”. ১৯৮৪ সালের ১৩ই এপ্রিল কুমায়ুনি ডিভিশনের বাহিনী ভারতীয় বিমান বাহিনীর সহায়তায় সিয়াচেন হিমবাহ পৌঁছেছিল. পাকিস্তানের সেনা বাহিনী চেষ্টা করেছিল ভারতীয় বাহিনীর গতিরোধ করতে, কিন্তু তা অসফল রয়ে গিয়েছিল. পক্ষ গুলির থেকে প্রাধান্য পাওয়ার মতো উচ্চতা লাভের এই বিরোধ নাম পেয়েছিল “শিখরের দিকে অভিযান” বলে. এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে এই হিমবাহের দুয়ের তৃতীয়াংশের উপরে নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সম্ভব হয়েছিল ও স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপত্যকা সিয়া- লা ও বিলাফন্ড- লা দখল করা সম্ভব হয়েছিল.

 এই হিমবাহ এলাকায় সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার মিটারের বেশী উচ্চতায় প্রায় মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রী পর্যন্ত কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল. উঁচু পাহাড়ী জায়গায় রসদ সরবরাহ ও তারই সঙ্গে সামরিক সহায়তা দেওয়া ভারতীয় সেনা বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল বিরল ধরনের সামরিক প্রযুক্তির জন্যই. সোভিয়েত দেশে তৈরী করা মি – ১৭ ধরনের হেলিকপ্টার সেই সময়ে ছিল বিশ্বের একমাত্র প্রপেলার সমেত যন্ত্র, যেগুলি জটিল পাহাড়ী পরিস্থিতিতে বহু উঁচুতে উড়তে সক্ষম ছিল. ভারতীয় সেনা বাহিনী তখন ৬৪০০ মিটার উচ্চতায় সোনাম নামের জায়গায় সিয়াচেন হিমবাহে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ী জায়গায় হেলিপ্যাড তৈরী করে এক ধরনের রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিল.

 সিয়াচেন বিরোধকে বলা হয় “ধিকিধিকি ভাবে জ্বলতে থাকা উত্তপ্ত বিন্দু” বলে. এখানে ১৯ বছর ধরেই বারে বারে যুদ্ধ শুরু হয়েছে ও থেমেছে. সবচেয়ে নৃশংস যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে. তখন পাকিস্তানের সেনা বাহিনী ভবিষ্যতে দেশের রাষ্ট্রপতি জেনারেল পারভেজ মুশারফের নেতৃত্বে চেষ্টা করেছিল ভারতীয় সেনা বাহিনীকে বিলাফন্ড- লা থেকে মেরে সরিয়ে দিতে. কিন্তু সেই সমস্ত অবস্থান দখল করা, যা কারাকোরাম গাড়ী চলাচলের রাস্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আর যেখান দিয়ে পাকিস্তান ও চিন সংযুক্ত হয়েছে, তা এমনকি পাকিস্তানের সবচেয়ে এলিট বাহিনীর কম্যান্ডোদের পক্ষেও সম্ভব হয় নি, যদিও তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর প্রশিক্ষকরা যুদ্ধ করতে শিখিয়েছিল. শেষ বড় ধরনের যুদ্ধ সাঁজোয়া গাড়ী ও বিমান বাহিনী ব্যবহার করে হয়েছিল ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে. ২০০৩ সালে ভারতও পাকিস্তান হিমবাহ অঞ্চলে অগ্নি সম্বরণের চুক্তি করেছিল.

 আজকের দিনে সিয়াচেন এলাকায় দুই পক্ষই ১১০ কিলোমিটার অগ্নি সম্বরণ সীমান্ত রেখার দুই দিকে ১৫০টি স্থায়ী চৌকি বসিয়েছে. উঁচু পাহাড়ী ক্যাম্পে নিয়মিত ভাবে তিন হাজার করে ভারতীয় ও পাকিস্তানী সেনা মজুদ রয়েছে. এই সামরিক বাহিনী পালনের জন্য পাকিস্তান প্রতি বছরে ১০ কোটি ও ভারত ৩০ কোটি ডলারের সমান অর্থ ব্যয় করে থাকে.

 এই বছরের এপ্রিল মাসে যখন পাকিস্তানের বাহিনীর ১২৪ জন সেনা ও ১১ জন নাগরিক ধ্বসে চাপা পড়ে এই এলাকায় মারা গিয়েছিলেন, তখন ইসলামাবাদে নতুন করে আবার হিমবাহ থেকে সেনা অপসরণের কথা বলা শুরু হয়েছিল. কিন্তু সেই আলোচনা, যা ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সচিবরা ১১ ও ১২ই জুন করেছেন, তা আবারও কোন ফল ছাড়াই শেষ হয়েছে. সামরিক বাহিনীর দপ্তরে বলা হয়েছে স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের উপরে দখল বজায় রাখার জরুরীত্ব নিয়েই. রাজনীতিবিদরা ঘোষণা করেছেন যে, সিয়াচেন নিয়ে প্রশ্ন কাশ্মীরের সমস্ত সমস্যার সমাধান না করে আলাদা করে করা সম্ভবপর নয়. কিন্তু আরও বেশী করেই ভারত ও পাকিস্তানের লোকরা একই প্রশ্ন তুলছেন: কেন, আর কিসের জন্য বহু সহস্র লোক প্রাণ দিয়েছেন? প্রসঙ্গতঃ এঁদের মধ্যে বেশীর ভাগই মারা গিয়েছেন যুদ্ধে নয়, বরং ধ্বসে চাপা পড়ে, গভীর খাদে পড়ে গিয়ে, ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে নয়তো অক্সিজেনের অভাবে.

 আজ বহু দিন হল, দুই দেশেরই সমাজে – পর্বতারোহী, পরিবেশ বিশারদ, সামাজিক কর্মীরা – আহ্বান করেছেন দেশের সরকারকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু যুদ্ধ ক্ষেত্রকে পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যান বানানোর জন্য. বিশ্বের “উঁচু পাহাড়ী উদ্যান” কথাটা অনেক ভাল শুনতে লাগে “উঁচু পাহাড়ী যুদ্ধ ক্ষেত্রের” চেয়ে.