সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষবৈঠকে, যা কয়েকদিন আগে বেজিং শহরে হয়েছে, সেখানে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সোমানাহল্লি কৃষ্ণ, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ নয়. এটা বোঝাই গিয়েছিল আপাততঃ যখন ভারতের অবস্থান এই সংস্থায় পর্যবেক্ষকের থেকে সদস্য করা হয় নি, তখন ভারত থেকে তো মনে হয় না শীর্ষবৈঠকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাউকে পাঠানো হবে. অন্তত এই প্রবন্ধের লেখক রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি তাই মনে করেছেন.

 যদিও ভারতের পক্ষ থেকে এই বৈঠকে যোগ দান করতে সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের নেতা আসেন নি, তাও এর মানে এই নয় যে, কৃষ্ণ যে বেজিং সফরে এসেছিলেন, তা স্রেফ সরকারি বিষয়ই ছিল. এই সফরের সময়ে মন্ত্রী তাঁর চিনের সহকর্মীদের সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন. আর দুই তরফ থেকেই – ভারত ও চিন- অনেক গুলি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছে, এই কথা উল্লেখ করে ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “একটি সবচেয়ে বাস্তব বিষয়, যা বেজিংয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তা হল, সেই সমস্যা, যা চিনের পক্ষ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদী বা তিব্বতে যে নদীকে ইয়ারলুং সাঙ্গপো বলে ডাকা হয়, তাতে বাঁধ দেওয়া প্রসঙ্গ নিয়ে – যা ভারতের গঙ্গা নদীর জলের একটি প্রধান উত্স. চিন এর মধ্যেই বেশ কিছু বছর ধরে অনেক গুলি নদীর জলের ধারা ঘুরিয়ে দেওয়া নিয়ে প্রকল্প করছে, যেগুলি তাদের উত্স শুরু করেছে তিব্বত থেকেই, সেগুলিকে নিয়ে যেতে চাইছে, নিজেদের জলের উত্স হীন শুকনো উত্তর পশ্চিম দিকের এলাকায়. আর যদি বেশীর ভাগ এই ধরনের প্রকল্পের সমস্যা চিনের আভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়েও থাকে, তবে ব্রহ্মপুত্র নদীতে কাজ সরাসরি ভাবেই এই নদীর নীচের দিকের অববাহিকার দেশ ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকারক”.

 আপাততঃ যখন চিনের পক্ষ থেকে জোর গলায় বলা হচ্ছে যে, ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দেওয়ার কারণ সেচের জন্য জল নিয়ে নেওয়া নয়, বরং জল বিদ্যুত উত্পাদনের প্রয়াস মাত্র, অর্থাত্ এই জলের বেশীর ভাগটাই আবার নদীর ধারাতেই ফেরত দেওয়া হবে. কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের নীচের দিকে স্রোত মেপে দেখা গিয়েছে যে, এখনই জলের স্তর অনেকটাই কমে গিয়েছে.

 বিশেষ করে এই সমস্যার সংবেদনশীল জায়গা হল এই বাঁধ দেওয়া হচ্ছে ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরে. অর্থাত্ একেবারেই ভারতের রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের কাছে, যে জায়গার অধিকার নিয়েও চিন দাবী করেছে.

 জল নিয়ে যুদ্ধ সম্বন্ধে রাজনীতিবিদরা অনেক দিনই হল বলছেন. এমনকি এই রকমও মনে করা হয় যে, একবিংশ শতাব্দীতে জল, খনিজ ও তেল ও গ্যাসের জায়গা নেবে, যা নিয়ে দেশ গুলির মধ্যে সাধারণত বিরোধ বেঁধে থাকে. এক রকম ভাবে জল নিয়ে ইতিমধ্যেই যুদ্ধ হচ্ছে. যেমন ভারতের ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের নানা কারণের একটি হল জলের ভাগ নিয়ে সিন্ধু নদীর উপরের দিকের অববাহিকায় বিরোধ. ব্রহ্মপুত্র নদীতে চিনের পক্ষ থেকে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টাও বিরোধ পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে বলে মনে করে বরিস ভলখোনস্কি উল্লেখ করেছেন:

 “চিন এশিয়ার বেশীর ভাগ দেশেরই নদী গুলির উপরের দিকের অববাহিকা দখল করে এক রকমের একচেটিয়া অবস্থানে রয়েছে. এই প্রসঙ্গে চিন একটিও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের অংশীদার নয় ও কোন একটি নদী নিয়েও বহুজাতিক কোনও চুক্তি স্বাক্ষর করে নি. প্রসঙ্গতঃ, ব্রহ্মপুত্র নদীর জলের ভাগ নিয়ে চিনের ভারতের সঙ্গে কোন রকমের চুক্তিই নেই, যা আরও বেশী করে সমস্যাকে ঘনীভূত করেছে.

 শুধু একটি বাস্তবই কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে: পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনার সময়ে এস. এম কৃষ্ণ ও ইয়ান শ্জেচি আগামী মাসে জল নিয়ে সরকারি ভাবে আলোচনা করতে শুরু করবেন”.

 এখানে আরও বেশী করে উল্লেখ করা দরকার যে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার কাঠামোয় দুই মন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে. যদি এই দেশ গুলির দিকে লক্ষ্য করা হয়, তবে খুব একটা কঠিন হবে না দেখতে পাওয়া যে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার প্রায় সমস্ত সদস্য দেশের মধ্যেই জল নিয়ে একে অপরের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে. সুতরাং বোধহয় এই ঐতিহ্য চালু রাখা দরকার ও দেশ গুলির মধ্যে জল নিয়ে আলোচনা এই সংস্থার কাজের অংশ হওয়া দরকার? অন্তত পক্ষে সেই সমস্ত দেশ যেমন রাশিয়া, ভারত, কাজাখস্থান ও উজবেকিস্তান এই প্রশ্নকে আলোচনার তালিকায় রাখার জন্য প্রস্তাব করতেই পারে.