বৃহস্পতিবারে কাবুল শহরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেত্তা বিগত সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে যত ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ঘোষণা করেছেন.

 হাক্কানি গোষ্ঠীর সন্ত্রাসবাদীদের, যারা পাকিস্তানের উত্তর- পশ্চিমে ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন – “আমরা একেবারে সহ্যের শেষ সীমায় এসে গিয়েছি”.

 ইসলামাবাদ উত্তর দিতে দেরী করে নি. পাকিস্তানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত শেরি রহমান ঘোষণা করেছেন: “এই ধরনের প্রকাশ্যে ঘোষণা, যা আমেরিকার প্রশাসনের একজন নেতার পক্ষ থেকে করা হয়েছে, তা পাকিস্তানে খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়ে থাকে. তা আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে পরস্পর বিরোধী মত পার্থক্য দূর করার জন্য আলোচনায় দূরত্ব কমানোর জন্য জায়গাকেই আরও কম করে দেয়”.

 পেন্টাগনের প্রধানের সমস্ত রকমের তীক্ষ্ণ ঘোষণা স্বত্ত্বেও তাতে কোন কিছুই নেই আচমকা বলার মতো, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভাবে সবচেয়ে খারাপ হয়েছে, আর কোন রকমের চিহ্নই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না যে, আগামী সময়ে তা ভাল হওয়ার. কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ হবে খেয়াল করা যে, এই ঘোষণা শুধু পাকিস্তানকে লক্ষ্য করেই করা হয় নি, অন্যান্য দেশ গুলির কথাও মনে করে করা হয়েছে, প্রাথমিক ভাবে ভারতকে লক্ষ্য করে”.

 এখানে নিজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আরও একটি বিষয়, তা হল প্যানেত্তা খুবই সঠিক জায়গা ও সময় বেছে নিয়েছেন এই ঘোষণা করার জন্য. তিনি কাবুলে এসে এই ঘোষণা করেছেন, এশিয়ার বাকী তিনটি দেশ – সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ভারত সফরের শেষে. এই সব দেশকেই একটি বিষয় এক করেছে – তাদের সকলেরই চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা রয়েছে. আর চিন – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ, যাদের এশিয়াতে প্রভাব রয়েছে. গত বছরের শেষ দিকে ঘোষিত এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন মনোযোগের স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী এই বাস্তবকেই সরকারি নীতি হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল.

 প্যানেত্তা নিজেও তাঁর এশিয়া সফরের শুরুতে চেষ্টা করেছিলেন ব্যাপারটাকে এই ভাবে দেখাতে যে, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি চিনের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর নয়. ঠিক এই রকমের ঘোষণাই তিনি তাঁর সফর শুরুর আগে করেছেন সিঙ্গাপুরে এসে. কিন্তু বাস্তব একই রয়েছে – চিনের দ্রুত বৃদ্ধি হওয়া প্রভাব – আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ব্যাথার কারণ হয়েছে. আর ওয়াশিংটন খুবই চেষ্টা চালাচ্ছে এশিয়াতে চিন বিরোধী ফ্রন্ট বানানোর, এই রকম মনে করে বরিস ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

 “ভারতকে এই স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী বিশেষ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে. দিল্লীতে থাকা কালীণ প্যানেত্তা খুবই সক্রিয়ভাবে নিজের ভারতীয় আলোচনার সহকর্মীদের রাজী করাতে চেয়েছিলেন আফগানিস্তানের যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের ভূমিকা বৃদ্ধির জন্য. এটা বোঝাই যাচ্ছে যে, করা হচ্ছে এই কারণে যে, যেমন পাকিস্তান, তেমনই চিনের প্রভাব কমানোর জন্য, কারণ পাকিস্তান বিগত বছর গুলিতে চিনের বিদেশ নীতিতে একটি শক্তিশালী লিভার হয়ে দাঁড়িয়েছে”.

 পাকিস্তানের দিকে সমালোচনা ঘোষণা করে ভারতবর্ষকে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে যে, ইসলামাবাদের সঙ্গে প্রাক্তন মৈত্রী ও সহযোগিতার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই. এর অর্থ হল, ভারতের আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই যে, তারা যদি ওয়াশিংটনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এশিয়া জোড়া প্রসারিত চিন বিরোধী জোটে যোগ দেয়, তবে এই রকম হবে না যে, পরে কখনও পটের পরিবর্তন হলে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রত্যাখ্যাত হবে.

 কিন্তু এখানেই ভারতের উচিত্ হবে খুবই ভাল করে তুল্য মূল্য বিচার করার. এই কথা ঠিক যে, চিনের প্রভাব বৃদ্ধিতে দিল্লীর আশঙ্কা বাড়ে. কিন্তু যেন এই রকম না হয় যে, ওয়াশিংটনের কথা মেনে নিয়ে ভারত এমন এক পরিস্থিতিতে পড়বে, যখন তাদেরই সমস্ত রকমের ক্ষয় ক্ষতি নিজেদেরই স্বীকার করে নিতে হবে – তাতে থাকবে আর্থিক, মানবিক ও শেষমেষ – দেশের সম্বন্ধে বিশ্বের ধারণার ক্ষতি? কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক স্ট্র্যাটেজি, যা এই বছরের জানুয়ারী মাসে ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে, আমেরিকা পরবর্তী কালে যুদ্ধে অংশ নেবে দূর থেকেই: তাদের যুদ্ধের কৌশল হবে বিমান ও ড্রোন ব্যবহার বাড়িয়ে. আর পদাতিক বাহিনী ও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে তাদের স্থানীয় জোটের লোকরা, যারা শত্রুর প্রতিবেশী দেশের লোক.