মঙ্গলবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেত্তার এশিয়ার দেশ গুলিতে সফরের শেষ অধ্যায় শুরু হতে চলেছে. তিনি ৫ও ৬ই জুন ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে  আলোচনা করবেন. পেন্টাগনের প্রধানের গন্তব্যের ভূগোল নিজে থেকেই বলে দিচ্ছে – শ্রী প্যানেত্তা সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে চেষ্টা করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ করে উল্লেখ করা মনোযোগের স্ট্র্যাটেজিক ক্ষেত্র যে বর্তমানে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা, তা প্রমাণিত করা. নিজের সফর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শুরু করেছিলেন প্রশান্ত মহাসাগরে হাওয়াই দ্বীপপূঞ্জ দিয়ে, তার পরে সেখান থেকে তিনি চলে এসেছিলেন সিঙ্গাপুর, বাত্সরিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনা শাংগ্রিলা আলোচনায় যোগ দিতে. পরের দুই দিন তিনি কাটিয়েছেন ভিয়েতনামে, আর তারপরে এই ভারত সফর. যদিও নিজের প্রকাশ্য বক্তৃতায় আমেরিকার মন্ত্রী সব রকম ভাবেই বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে যে মনোযোগ দিয়েছে, তা এই এলাকার কোন বিশেষ দেশের বিরুদ্ধেই লক্ষ্য করা হচ্ছে না, তবুও তাঁর সফরে চিন বিরোধী অংশ প্রকট ভাবেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এই বিষয়ে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ও বর্তমান প্রবন্ধের লেখক বরিস ভলখোনস্কি খুবই দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে আলাদা করে উদ্ধৃতি দিয়েছেন.

 “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের কেন্দ্র এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতে সরে আসার বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য পেশ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা গত বছরে অস্ট্রেলিয়া সফরের সময়ে নভেম্বর মাসে. এই বছরের শুরুতে পেন্টাগন প্রকাশ করেছে স্ট্র্যাটেজিক নির্দেশ, যা এই রাজনৈতিক লক্ষ্যকে আরও বিশদ ও নির্দিষ্ট করেছে. এই নির্দেশে খুবই স্পষ্ট করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে চিনের সামরিক ক্ষমতার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, আর বিশেষ করে জোর দেওয়া হয়েছে এই এলাকায় ভারতকে প্রধান সহকর্মী দেশ হিসাবে টেনে আনার বিষয়ে”.

 ভারত ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকায় আলাদা করে বাজী ধরেছে ভিয়েতনামের উপরে – আর এটা সেই বিষয়কে না বিচার করেই যে, বহু আমেরিকার ও ভিয়েতনামের লোকের স্মৃতিতে এখনও রয়ে গিয়েছে কঠিন লড়াইয়ের বছর গুলির ঘটনা. কিন্তু বর্তমানের ঘটনার যুক্তি বাধ্য করেছে প্রাক্তন শত্রুতা থেকে যদি একত্রে জোট বাঁধা সম্ভব নাও হয়, তবে অন্তত সহকর্মী হওয়া ও সহযোগিতা করার পথে চলতে. ভিয়েতনামেরও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য আরও কিছু দেশের মতোই চিনের সঙ্গে এলাকা সংক্রান্ত বিবাদ রয়েছে দক্ষিণ চিন সাগরের কিছু দ্বীপের অধিকার নিয়ে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিবাদে  সরাসরি চিন বিরোধী অবস্থান নিয়েছে. আর ভিয়েতনাম সফরের সময়ে লিওন প্যানেত্তা প্রথম এত উচ্চপদস্থ আমেরিকার অতিথি হয়েছেন, যাঁকে ভিয়েতনামের লোকরা নিজেদের সামুদ্রিক নৌবহরের ঘাঁটি কামরান অন্তরীপে যেতে দিয়েছে, যা আমেরিকা – ব্রিটেনের যুদ্ধের সময়ে আমেরিকার দখলে ছিল.

 অবশেষে সিঙ্গাপুর. বাত্সরিক শাংগ্রিলা আলোচনার জায়গা আচমকাই এখানে বাছা হয় নি. সিঙ্গাপুরকে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনায় বিশেষ করে জায়গা দেওয়া হয়েছে – এমনি কোন কারণ ছাড়াই এই বছরের এপ্রিল মাসে পেন্টাগন থেকে ঘোষণা করা হয় নি যে, এই ছোট্ট দেশে এর পর থেকে স্থায়ী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে চারটি বড় নৌবহর থাকবে. বিষয়টির কারণ হল যে, সিঙ্গাপুরে রাখা যুদ্ধ জাহাজ গুলি, মালাক্কা প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার সবচেয়ে সরু এলাকায়. আর মালাক্কা প্রণালী হল সেই প্রধান বাণিজ্য পথের অংশ, যা দিয়ে চিন তাদের দেশে আমদানী করা বেশীর ভাগ মালই নিজেদের বন্দরে নিয়ে যায় – প্রাথমিক ভাবে নিকট প্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আনা খনিজ তেল. এই ভাবেই, লিওন প্যানেত্তার সফর সব মিলিয়ে করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহকর্মী দেশ গুলিতেই, তাদের চিনকে বেঁধে রাখার স্ট্র্যাটেজি করতে গিয়ে. আর এখানেই বিশেষ করে খেয়াল করা দরকার বলে, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি আলাদা করে উদ্ধৃতি যোগ করতে চেয়েছেন:

 “যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিনকে আটকে রাখার লক্ষ্য সব মিলিয়ে ও পুরোটাই ভারতের স্বার্থের উপযুক্ত হয়, তাহলেও যখন কথা ওঠে অন্যান্য দেশ নিয়ে, যেগুলিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ভারতের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে কিন্তু এই ধরনের স্বার্থের মিল দেখতে পাওয়া যায় না. যেমন, ইরানের প্রতি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আপাততঃ ভারত যথেষ্ট পরম্পরা মেনেই নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে স্বাধীন ভাবেই. কিন্তু যদি এখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান প্রসঙ্গে রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতের হাত পিছনে পাকিয়ে মুচড়ে ধরছে, তবে, এর পরে কি আর হতে পারে, যখন তাদের পক্ষে কিছু একটা চিন বিরোধী জোট এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতে বানানো সম্ভব হয়ে যাবে”?

 ভলখোনস্কি মনে করেন যে, এখন অপেক্ষা করা যেতেই পারে যে, চাপ শুধু বাড়তেই থাকবে, আর এই জোটের ছোট সহকর্মীদের তাদের মহা সমুদ্র পারের সহকর্মীদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজেদের স্বার্থের কিছুটা বিসর্জন দিতে হতে পারে.