রাশিয়ার কম্পিউটার ভাইরাস প্রতিরোধ কোম্পানী “কাস্পেরস্কি ল্যাবরেটরীর” বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক বৈদ্যুতিক যোগাযোগ সংগঠনের সঙ্গে একত্রে নিকট প্রাচ্যের কয়েকটি দেশে নতুন ধরনের এক ক্ষতিকারক প্রোগ্রামের খোঁজ পেয়েছেন. তাঁদের কথামতো, কিছু দেশের পক্ষ থেকে সাইবার গুপ্তচর বৃত্তির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে. এর আগে হওয়া সমস্ত রকমের সাইবার বিপদের চেয়ে জটিলতা ও তার কাজের পরিধি অনুযায়ী এই প্রোগ্রাম অনেক উচ্চ মানের.

 উল্লেখযোগ্য যে, ভাইরাস নিকট প্রাচ্যের বাইরে লক্ষ্য করতে পারা যায়নি. “কাস্পেরস্কি ল্যাবরেটরীর” তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশী এই ভাইরাসের ব্যবহার লক্ষ্য করা গিয়েছে ইরানে – ১৮৯ বার, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন স্বয়ং শাসিত অঞ্চল – ৯৮ বার, তাদের পরে সুদান, সিরিয়া, লিবিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী ও ইজিপ্ট.

 ইরানে ভাইরাস খনিজ তেল মন্ত্রণালয়ের ও খনিজ তেল সরবরাহের কেন্দ্রে ছড়িয়েছিল. দেশের প্রতিনিধি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই ভাইরাস প্রসার হওয়া বন্ধ হয়েছে ও তথ্যের আসল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি, কিন্তু এই রকম মনে করার কারণ আছে যে, এই ভাইরাস, মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বহু মাস আগেই আক্রমণ করেছিল ও তার প্রধান কাজ অর্থাত্ তথ্য সংগ্রহ ও তা পাচারের কাজ করে ফেলেছে.

 প্রাথমিক ভাবে পাওয়া ফল অনুযায়ী এই ক্ষতিকর প্রোগ্রাম, যার নাম দেওয়া হয়েছে “ফ্লেম” (অগ্নিশিখা), তা খুবই সক্রিয়ভাবে বছর দুয়েক হল ব্যবহৃত হচ্ছে. নিজের খুবই জটিল গঠনের জন্য ও তা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে অভিমুখ থাকায়, এতদিন অবধি তা কোন একটিও সুরক্ষা করার জন্য তৈরী প্রোগ্রাম দিয়ে ধরতে পারা যায় নি. সাইবার আক্রমণের একটি সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল যে, এই প্রোগ্রামের ব্যবহারকারীরা সব সময়ে সংক্রামিত নেটওয়ার্কের উপরে নজর রেখেছে, তথ্য সংগ্রহ করেছে ও নতুন লক্ষ্য স্থির করেছে নিজেদের লক্ষ্য সাধনের জন্য. “ফ্লেম প্রোগ্রাম কোন রকমের অর্থ রোজগারের জন্য ব্যবহার করা হয় না ও তার মালিকের কোন রকমের অর্থ লাভের ব্যবস্থা করে দেয় না”, - এই রকম মনে করে “কাস্পেরস্কি ল্যাবরেটরীর” একজন নেতৃস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ভিতালি কামল্যুক বলেছেন:

 “এই প্রোগ্রাম তৈরী করাই হয়েছে যাতে কোন গোপন ও মূল্যবান তথ্য লুঠ করা সম্ভব হয়, আড়ি পেতে শোনা যায়, ব্যবহারকারী কি করছে. তা মাইক্রোফোন চালু করে দিতে পারে, ধ্বনি রেকর্ড করতে পারে ও তা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পাঠাতে পারে. কম্পিউটারের মনিটরের ছবি তুলে সেই সব লোকেদের ইন্টারনেটে পাঠিয়ে দিতে পারে, যারা এই প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করছে. আর স্বাভাবিক ভাবেই মূল্যবান ফাইল আর গোপন তথ্য সরকারি সংস্থা থেকে নকল করতে পারে. আরও একটা বিশেষত্ব এই প্রোগ্রামের রয়েছে, সেটা লুকিয়ে থাকতে পারে. তার স্রষ্টারা পরীক্ষা করতে পারে যে, কোন স্থানীয় কম্পিউটারে ভাইরাস প্রতিরোধ করার প্রোগ্রাম আছে কি না, আর যদি থাকে তবে তা সম্পূর্ণ ভাবে নিজের কাজের ধারা পাল্টাতে পারে, যাতে কোন রকমের সন্দেহ তৈরী না হয়. প্রোগ্রাম নিজের গঠনের দিক থেকে খুবই জটিল আর তা শুধু বিশ্লেষকদেরই গুলিয়ে দেয় না, বরং স্রষ্টারাও গুলিয়ে ফেলে. বোধহয়, এই প্রোগ্রামের উপরে অনেক সংখ্যক লোক একসাথে কাজ করেছে”.

 “কাস্পেরস্কি ল্যাবরেটরীর” বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা করেছিলেন অনুসরণ করে দেখতে, কে, কোথা থেকে এই প্রোগ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করছে. দশটিরও বেশী সার্ভার বার করা সম্ভব হয়েছিল, যা বিশ্বের বিভিন্ন কোনে রয়েছে, যেখানে নকল তথ্য দেওয়া হয়েছে. এর ফলে এই প্রোগ্রামের স্রষ্টাদের খুঁজে বার করা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছে.

 একই সময়ে ভেনেজুয়েলা দেশের সরকারি রেডিও থেকে পেন্টাগনের উত্স উল্লেখ করে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া ও ইরানের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে বলে খুবই বেশী মনোযোগ দিয়েছে নতুন প্রজন্মের সাইবার অস্ত্র বানানোর দিকে, যা বিপক্ষের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা একেবারেই খারাপ করে দিতে পারে. “সেই সব, যা আমরা খুঁজে পেয়েছি, তা এক সারি আক্রমণ করার যন্ত্র”, - আরও বলেছেন “কাস্পেরস্কি ল্যাবরেটরীর” ভিতালি কামল্যুক:

 “ফ্লেম প্রোগ্রাম, যে তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তার নির্দেশে নিজেই ছড়াতে সক্ষম ও কম্পিউটার, ডিস্ক ও আরও নানা ধরনের তথ্য ভাণ্ডার সংক্রমণ করতে সক্ষম. আমরা বের করতে পেরেছি যে, তা সেই ধরনের প্রোগ্রামের মধ্যে পড়ে, যা সাইবার অস্ত্র বলা যেতে পারে. এই ধরনের ক্ষতিকর প্রোগ্রামের মধ্যে রয়েছে “ওয়ার্ম”, “স্টাক্সনেট” ইত্যাদি, যা আমরা এখন জানি, যা সম্ভবতঃ ব্যবহার করা হয়েছিল ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনার গতি শ্লথ করার জন্য, আর “ডুকু” নামের প্রোগ্রাম, যা ব্যবহার করা হয়েছিল পেশাদার ভাবে সাইবার গুপ্তচর বৃত্তির জন্য”.

 এখন বেশ কয়েক বছর ধরেই সাইবার ক্ষেত্রে সামরিক অপারেশনের আশঙ্কা তথ্য নিরাপত্তা বিষয়ের একটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, - এই রকম মনে করে “কাস্পেরস্কি ল্যাবরেটরীর” জেনারেল ডিরেক্টর ইভগেনি কাস্পেরস্কি যোগ করেছেন যে, “এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল এই ধরনের সাইবার অস্ত্র যে কোন দেশের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা যেতে পারে. তাছাড়া, সাইবার যুদ্ধে, ঐতিহ্য অনুযায়ী যুদ্ধের ব্যতিক্রম হিসাবে সেই সব দেশই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যারা উন্নত”.

 কিছু দিন আগেও এই প্রোগ্রাম কাজ করেছে, এখন সমস্ত “ফ্লেম” ছড়ানোর সার্ভার অকেজো করে দেওয়া হয়েছে, আর প্রোগ্রাম সক্রিয় নয়. সংক্রামিত কম্পিউটার গুলি কোথাও যায় নি, কিন্তু তাদের উপরে আক্রমণ কারীরা এখন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না. তারা নতুন করে সাইবার অস্ত্রের কাজ কি শুরু করতে পারে? পরের বার তা কার দিকে লক্ষ্য করে করা হবে? কারণ যে কোন কম্পিউটারই তাদের লক্ষ্য হতে পারে.