বিশ্বনাথন আনন্দ দাবাতে পঞ্চম বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে দাবার মুকুট সেই খেলার ও নিজের জন্মভূমিতেই আবার ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, নিজের চেন্নাই শহরে.  তিন সপ্তাহ ধরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা মস্কো শহরের বিশ্ব বিখ্যাত ত্রেতিয়াকভস্কি গ্যালারিতে প্রাক্তন সোভিয়েত দেশে জন্ম হওয়া ও বর্তমানে ইজরায়েলের নাগরিক বরিস গেলফান্ডের সঙ্গে চলেছিল. ১২টি ম্যাচের প্রত্যেক টিতেই খেলা শেষ হওয়ার পরের সাংবাদিক সম্মেলনে আনন্দ ছিলেন খুবই কম কথার মধ্যে – একটি বড় জোর দেড়টি বাক্য, তার বেশী নয়. আর খেলা শেষের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে রেডিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে যে, তিনি রুশ দাবার স্কুল সম্বন্ধে কি রকমের মূল্যায়ন করে থাকেন, আনন্দ নিজে অনেকটা স্থৈর্যের প্রদর্শন করেও একটি মজার ব্যাপার নিয়ে গল্প করে বলেছেন:

 “একবার অনেক আগে মস্কোতে ভারতীয় দাবাড়ুদের একটি দল এসেছিল. তাদের কাছে অতিথি পরায়ণ আমন্ত্রণ কারীরা প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা কি দেখতে চান ও কি বিষয় নিয়ে সবার আগে পরিচিত হতে চান? উত্তরে শুনেছিলেন যে, আমাদের বিখ্যাত সোভিয়েত (রুশ) দাবার স্কুল দেখানো হোক.

 কিন্তু এটাতো আসলে কোনও ভবন ছিল না, যেখানে দাবাড়ুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত – এটা তখনও ছিল, আর এখনও এই স্কুল শব্দের গভীর অর্থের মধ্যেই রয়েছে”.

 বিশ্বনাথন আনন্দের জন্য রুশ দাবা স্কুলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর শিশু বয়সেই. তিনি জন্মেছিলেন ও থাকতেন চেন্নাই শহরে, বাড়ীর কাছেই ছিল তত্কালীন সোভিয়েত (বর্তমানে রুশ) বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ভবন, যেখানে বিখ্যাত সোভিয়েত দাবাড়ু মিখাইল তালের নামে দাবা স্কুল ছিল. তার পরে তিনি নয়া দিল্লী শহরে এসে আরও একজন বিখ্যাত রুশ দাবাড়ু মিখাইল বতভিন্নিক নামাঙ্কিত রুশ দাবা স্কুলে খেলা শিখতে যেতেন. এই খবর আমাদের সাংবাদিককে ভারতীয় সাংবাদিক জয়দীপ উনুদুরতি বলেছেন, যিনি ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের জন্য এখানে এসেছিলেন এই খেলার সম্বন্ধে রিপোর্ট করতে. কিন্তু সব কিছু নিয়ে বিশদ করে বলেছেন বিশ্বনাথন আনন্দ নিজেই, তিনি বলেছেন:

 “আমি চেন্নাই শহরের সোভিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মিখাইল তালের নাম নিয়ে তৈরী দাবা স্কুলে বড় হয়েছি. আমার জন্য সেখানের অনুশীলনের অনেক লাভ হয়েছিল. সেখানে ক্লাস হত সপ্তাহে তিন দিন. সোমবার ও বৃহস্পতিবারে দিনের অপরাহ্নে আর রবিবার পুরো দিনটাই আমি সেখানে খেলা শিখতাম. সেখানে খুব ভাল সব দাবা খেলার শিক্ষক ছিলেন. আমি তাদের আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সানন্দে যোগ দিতাম”.

 বরিস গেলফান্ডের সঙ্গে মস্কোতে সদ্য শেষ হওয়া ম্যাচ খুবই উত্তেজনা পূর্ণ ও কঠিন ছিল, - স্বীকার করেছেন বিশ্বনাথন আনন্দ. – আর বরিস গেলফান্ড নিজে মনে করেছেন যে, এই ম্যাচের সময়ে দাবা খেলার জন্য নতুন নিয়ম ঠিক হয়ে গিয়েছে. তিনি এই ম্যাচ চলার সময়ে টাই- ব্রেকের ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছেন, তিনি বলেছেন:

 “আমি মনে করি যে, এটা ম্যাচ শেষ করার জন্য একটা উপযুক্ত ব্যবস্থাই করা হয়েছে.

 রাশিয়া বিশ্ব দাবার রাজধানী হয়েই রয়েছে”.

 মে মাসের তিনটি বিগত সপ্তাহে বিশ্বনাথন আনন্দ ও বরিস গেলফান্ডের মধ্যে আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশনের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই বিশ্বের সমস্ত জায়গা থেকে প্রায় এক কোটি লোক ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখেছেন. এই খেলা হয়েছে কোন রকমের সমঝোতা বিহীণ লড়াই করে. আর বিশ্বের দাবার ইতিহাসের পাতায় এই খেলা এক উজ্জ্বল পাতা হয়েই রয়ে গেল, - এই রকম মনে করেছেন এই খেলার স্পনসর ও রাশিয়ার এক বড় ব্যবসায়ী আন্দ্রেই ফিলাতভ. তিনি এই খেলার প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য আড়াই মিলিয়ন ডলার পুরস্কার অর্থ ব্যয় করেছেন.

 এই খেলার শর্ত অনুযায়ী অর্থের ষাট শতাংশ পেয়েছেন বিজয়ী ও চল্লিশ শতাংশ পেয়েছেন বিজিত. বিশ্বনাথন আনন্দ এছাড়া মস্কো থেকে নিয়ে যাচ্ছেন বিজয়ীর সোনার কাপ, অলিভ পাতার মতো দেখতে বিজয়ীর মালা, এটা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে আনুষ্ঠানিক ভাবে. এই সময়ে একটি ফার্স্ট ডে ক ভার প্রকাশিত হয়েছে, রাশিয়ার পোস্ট এই উপলক্ষে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে.

 - “খুবই চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চেন্নাই ফিরে যেতে. বলে বোঝাতে পারছি না, এক বছরের ছোট্ট ছেলেটির জন্য কি রকম মন খারাপ করছে” – আমাদের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবা খেলোয়াড় এই কথাই স্বীকার করেছেন.