এই সপ্তাহে দিল্লীতে তিন দিন ব্যাপী এক সেমিনার হয়েছে, যাতে ১৬টি দেশের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছিলেন – যাঁরা আন্তর্জাতিক “উত্তর দক্ষিণ” করিডর নামের পরিবহন পথ সংক্রান্ত প্রকল্পের অংশীদার. বিশেষজ্ঞরা যেমন উল্লেখ করেছেন, এখনই আগামী বছরে এই করিডর দিয়ে প্রথম পরীক্ষা মূলক ভাবে মাল বহনের প্রচেষ্টা করা যেতে পারে – ভারত থেকে ইরান হয়ে রাশিয়া অবধি. এই বিষয়ের ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “সেই ২০০০ সালেই “উত্তর দক্ষিণ” পরিবহন পথ তৈরী করার ধারণার উদয় হয়েছিল, তার উদ্যোগ নিয়েছিল রাশিয়া, ইরান ও ভারত. কিন্তু বাস্তবে এই প্রকল্প রূপায়নের জন্য সব পক্ষই অনেক দিনই কোন কাজ করে নি. অথচ আজ এই প্রকল্পের অংশীদার হয়েছে ১৬টি রাষ্ট্র, তাদের মধ্যে মধ্য এশিয়ার সমস্ত দেশ. এই করিডরের ধারণা হল এই রকমের যে, ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দর গুলিকে (প্রাথমিক ভাবে মুম্বাই) ইরানের আরব সাগরের বন্দর গুলির (বান্দেরাবাস ও চাহবাহার)সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, সেখান থেকে মাল রেল পথে ইরানের কাস্পিয় সাগরের বন্দর হয়ে – সমুদ্র ও সড়ক পথে (আজারবাইজান হয়ে) মধ্য এশিয়ার দেশ গুলিতে, রাশিয়ায় ও তারপরে ইউরোপে যাবে”.

 অর্থনৈতিক ভাবে এই প্রকল্প সমস্ত দেশের জন্যই লাভজনক. তা বর্তমানের পথ গুলির তুলনায়, যা সুয়েজ প্রণালী হয়ে করা হয়ে থাকে, অনেক খানি সময় মাল পরিবহনের ক্ষেত্রে বাঁচায়, ভারত থেকে ইউরোপের ক্ষেত্রে প্রায় এক মাস- বর্তমানের ৪৫- ৬০ দিনের জায়গায় ২৫- ৩০ দিন. তাছাড়া ভারত মধ্য এশিয়ার খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ গুলিতে পাবে সরাসরি বের হওয়ার রাস্তা. এটা বর্তমানের পরিস্থিতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যখন দেশের উন্নতিশীল অর্থনীতি খুবই প্রয়োজন বোধ করেছে বাড়তি জ্বালানীর, আর পাকিস্তান ও আফগানিস্তান হয়ে ভারতে পরিবহনের রাস্তা স্পষ্টই বন্ধ রয়েছে.

 এই পথ পশ্চিমের জোটের সেনা দলের আফগানিস্তান থেকে আসন্ন প্রত্যাহারের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ. তা ভারতের জন্যও এই দেশের সঙ্গে সবচেয়ে ভরসা যোগ্য ও নিরাপদ ভাবে যোগাযোগের পথ খুলে দেবে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য – অংশতঃ, লোহার আকরিক খনি থেকে উত্তোলন ও ইস্পাত উত্পাদন প্রকল্পের রূপায়নের জন্য. এই পরিকল্পনা গুলি, যদি তা করা সম্ভব হয়, তবে ভারতকে আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগ কারী দেশে পরিণত করবে, - এই রকমের বিশ্বাস নিয়ে বরিস ভলখোনস্কি আরও বলেছেন:

 “কিন্তু এখানে হিসেব করা দরকার যে, বর্তমানের বিশ্বে অর্থনীতি রাজনীতি থেকে আলাদা আর নেই. আর এই ভাবে দেখলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি (প্রাথমিক ভাবে – এই এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ) এই প্রকল্পের সামনে অনেক কঠিন ভাবে সমাধান হওয়ার মতো সমস্যা উপস্থিত করেছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপরে চাপ বাড়িয়ে চলছে. আপাততঃ এটা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের বাইরে যাচ্ছে না. কিন্তু কেউই ভরসা করে এই সম্ভাবনা বাদ দিতে পারছে না যে, শেষ অবধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা তাদের নিকট প্রাচ্যের উপগ্রহ – ইজরায়েল – “ইরানের সমস্যার” শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানের পথ ধরবে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য খুবই চায় ভারতকে তাদের সঙ্গে “একই বন্ধনে” আবদ্ধ হিসাবে দেখতে. একটা দূরত্ব অবধি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ একই রকমের – সেটা এশিয়াতে প্রসারিত অর্থে ও বিশেষ করে মধ্য এশিয়াতে চিনের পরিসর বন্ধ করা নিয়ে. কিন্তু ইরান প্রশ্নে ভারত আমেরিকার সঙ্গে মূল গত ভাবেই আলাদা অবস্থান নিয়ে রেখেছে”.

 যদিও বিগত সময়ে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে ইরান থেকে কিছু অংশে খনিজ তেল কেনা কমিয়েছে, এটা ভারতের অর্থনীতির জন্য ইতিমধ্যেই গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করেছে. আর তাই ভারত ইরান প্রশ্নে একেবারেই ঠিক ভাবে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে চলেছে. বৃহস্পতিবারে দিল্লীতে ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান আলি আকবর সালেখি সফরে এসেছেন. সেই পরিস্থিতিতে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে বাধ্যতা আদায়ের জন্য নিজেদের চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে ও তার জন্য নানা রকমের পদ্ধতি নিচ্ছে (যেমন, ইরানে পশ্চিমের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ব্যবহার করে টাকা পাঠানো বন্ধ করা অথবা ইরানের সেই সমস্ত ট্যাঙ্কার যা খনিজ তেল বহন করে আনে, তা বীমা করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা নেওয়া), আর ভারত এবং ইরানও সেই বিষয়ে আগ্রহী যে, এই ধরনের জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ বের করতে.

 কিন্তু প্রশ্নের উদয় হয়: এই চেষ্টা ওয়াশিংটনে নতুন করে ক্রোধের সৃষ্টি করবে না তো আর এই টানটান উত্তেজিত অবস্থাকে টলিয়ে দিয়ে এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার পথে মাইন পাতবে না তো – তার মধ্যে “উত্তর দক্ষিণ” পরিবহন করিডর প্রকল্পও রয়েছে?