রবিবারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের মায়ানমার (প্রাক্তন বর্মা) সফর শুরু হয়েছে – গত ২৫ বছরের মধ্যে ভারতের প্রশাসন প্রধানের এই দেশে কোনও সরকারি সফর. মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রশ্ন গুলি, যদিও আসলে এই সফরের উদ্দেশ্য অনেক বেশী প্রসারিত. ভারতের খুবই প্রয়োজন, সেখানে নিজেদের জায়গা “স্থির করার” ও এই স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়ানো, যা বহু দশক ধরেই বাস্তবে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল ও মাত্র কিছু দিন আগেই আবার করে খুলতে শুরু করেছে.

 ভারতের জন্য মায়ানমারের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব বাড়িয়ে বলা কঠিন. এটা নিকটতম প্রতিবেশী দেশ, যাদের সঙ্গে ভারতের পারস্পরিক সীমান্ত ১৬০০ কিলোমিটার. যতই প্যারাডক্স মনে হোক না কেন, মায়ানমারের এলাকা ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দেশের উত্তর পূর্বের রাজ্য গুলির সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজতম পথ. এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে, ভারত – বর্মার সম্পর্ক কখনই খুব একটা সহজ ছিল না. ১৯৬২ সালে, যখন বর্মার প্রশাসনে সামরিক জুন্টা দখল নিয়েছিল, তখন নতুন প্রশাসকরা ভারতীয়দের সমস্ত কল কারখানা জাতীয় করণ করে নিয়েছিল আর দেশ থেকে বহু লক্ষ ভারতীয় লোককে তাড়িয়ে দিয়েছিল, যাদের সেখানে ফেলে আসতে হয়েছিল, সমস্ত অর্জিত সম্পত্তি.

 ১৯৯৩ সালে ভারতের সরকার জওহরলাল নেহরুর নামাঙ্কিত মর্যাদাময় পুরস্কার দিয়ে বর্মার বিরোধী পক্ষের নেত্রী আউন সান সু চ্ঝি কে সম্মানিত করেছিল. যার ফলে মায়ানমারের সরকার বিরক্ত হয়েছিল. কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভারতকে নিজেদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আবার করে বিচার করতে হয়েছে. সমস্যার মূল সেখানেই যে, মায়ানমার, বাস্তবে আন্তর্জাতিক ভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে থাকলেও চিনের পররাষ্ট্র নীতির কক্ষপথে বাঁধা পড়েছিল, তাদের মুক্তা মালা স্ট্র্যাটেজির একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে. এই স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য – ভারতকে সমুদ্র পথে এক সারি বন্দর ও সামরিক নৌবাহিনীর ঘাঁটি দিয়ে ঘিরে ফেলা. জানাই আছে যে, চিন, পশ্চিমের দেশ গুলির তুলনায়, সেই ধরনের ধারণা, যেমন শাসনের অ গণতান্ত্রিক চরিত্র অথবা তাদের সহকর্মী দেশ গুলিতে মানবাধিকার লঙ্ঘণ ইত্যাদি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “চিনের জন্য মায়ানমার এক অত্যন্ত বিশিষ্ট অর্থ রাখে – ব্যাপারটা হল যে, নিকট প্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার সমস্ত দেশ থেকেই সব ধরনের মাল চিনে পাঠানো হয়ে থাকে সমুদ্র পথে, আর এর অর্থ হল যে, এই সব জাহাজের মালাক্কা প্রণালীর খুবই সরু ও জলদস্যূ কবলিত এলাকা দিয়ে চিনের বন্দরে আসতে হয়, তার ওপরে আবার বর্তমানে এই প্রণালীর পথ চিনের প্রতি খুব একটা বন্ধু ভাবাপন্ন নয়, এমন সব দেশের নৌবাহিনী দিয়েও আটকে দেওয়া সম্ভব – এই দেশ গুলির মদ্যে প্রাথমিক ভাবে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার সহযোগী দেশ গুলি. তাই চিনের জন্য বেঁচে থাকার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে বিকল্প পথের সন্ধান, তা পাকিস্তানের গাদার বন্দর ও মায়ানমারের ক্যাউকপিউ বন্দর, তাদের সঙ্গে উপযুক্ত ভাবে সড়ক ও পাইপ লাইন করে যোগ সাধন করে তৈরী করা হলে, যা মালাক্কা প্রণালীর পথ পরিত্যাগ করতে সহায়তা করতে পারত. ভারত চিনের এই পরিকল্পনা গুলিতে নিজেদের নিরাপত্তার সমস্যা দেখতে পেয়েছে সঙ্গত কারণেই. আর তাই তারাও নিজেদের জাতীয় স্বার্থে এই দেশে পরিকাঠামো ও বন্দর নির্মাণ শুরু করেছে সিতুয়ে বন্দরে, যাতে বন্দর ও সড়ক পথে বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর পূর্বের রাজ্য মিজোরামে পৌঁছনো সম্ভব হয়. আর এর জন্যই ভারতের পক্ষ থেকে মায়ানমারের অ গণতান্ত্রিক প্রশাসনের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে”.

 গত বছরের শেষে পশ্চিম ও মায়ানমারের সম্পর্কেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে শুরু করেছে. দেশের নতুন সরকার বহির্বিশ্বকে সঙ্কেত দিয়েছে যে, তারা কিছু গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন করতে তৈরী. অংশতঃ, ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বন্দী দশা থেকে আউন সান সু চ্ঝি কে, তিনি আবার দেশের পার্লামেন্টের অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন. কতটা এই পুনর্গঠন পরম্পরা মেনে এই দেশে করা হবে, তা কেউ বলতে পারে না, তবে এটাই যথেষ্ট হয়েছে, যাতে পশ্চিম থেকে এই দেশের উপরে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় ও সেখানকার নেতারা এবারে প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন কে আগে এই দেশে যাবে. ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন সেখানে গিয়েছিলেন. তার পরেই পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলির নেতারা বর্মার পথ ধরেছেন.

 একেবারেই নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যাতে বর্মার প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের জন্য ও এই স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রভাবের জন্য লড়াই প্রত্যেক দিনই তীক্ষ্ণ হচ্ছে, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে চাওয়া লোকদের সংখ্যা প্রত্যেক দিনই বেড়ে যাচ্ছে. আর তাই ভারতকে তাড়াহুড়ো করতে হবে, যাতে বিগত বছর গুলিতে যা জয় করা সম্ভব হয়েছে, তা ছেড়ে দিতে না হয়.