কাস্পিয় সাগরের তীরে এক তুর্কমেনিস্থানের পর্যটন কেন্দ্রে সরকারি কর্পোরেশন তুর্কমেনগাজ তাদের ভারত ও পাকিস্তানের সহকর্মীদের সাথে ভবিষ্যতে এই দেশ গুলিতে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে চুক্তি করেছে. এই চুক্তি গ্যাস পাইপ লাইন তৈরীর প্রকল্প শুরু করার জন্য আনুষ্ঠানিক কারণ হয়েছে, যা এই তিনটি দেশকে জুড়বে, আফগানিস্তানের ভিতর দিয়ে গিয়ে.

 তুর্কমেনিয়া- আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত (তাপি) প্রকল্প নিয়ে কথা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৯৩ সালে. কিন্তু তা বাস্তবের জমিতে নিয়ে আসা কিছুতেই সম্ভব হয় নি. যদিও এই ধারণাতে একেবারে শুরু থেকেই খুবই শক্তিশালী সমর্থন ওয়াশিংটনের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, এই প্রকল্পের পথে সারাক্ষণ খালি বাধাই উপস্থিতি হয়েছে.

 রেডিও রাশিয়াকে তাপি প্রকল্পের ভবিষ্যত নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন আমাদের সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ ও স্বাধীন রাষ্ট্র সমূহের ইনস্টিটিউটের মধ্য এশিয়ার দেশ গুলি নিয়ে বিভাগের প্রধান আন্দ্রেই গ্রোজিন.

 এরমোলায়েভ বলেছেন:

 “ধারণা করা হয়েছে, তাপি গ্যাস পাইপ লাইনের দৈর্ঘ্য, যা তুর্কমেনিস্থানের গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্র ও পাকিস্তান ও ভারতের গ্রাহকদের কাছে অবধি যাবে, তা ১৭০০ কিলোমিটারের বেশী. এই পাইপ লাইন দিয়ে বছরের তিন হাজার তিনশ কোটি কিউবিক মিটার গ্যাস পাঠানো যেতে পারবে. এই ধরনের কাজের বিশালত্ব- চমকপ্রদ. আর প্রকল্পের ইতিহাস বেশী ভাবেই গোয়েন্দা গল্পের মতই মনে হয়েছে. সেই ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনার কোম্পানী ব্রিডাস তুর্কমেনিয়া দেশে গ্যাস উত্তোলনের বিষয়ে বেশ কয়েকটি টেন্ডার জয় করেছিল, তারাই প্রথমে প্রস্তাব করেছিল আফগানিস্তান পার হয়ে গ্যাস পাইপ লাইন তৈরী করা নিয়ে. তারপরে এই প্রকল্প নিয়ে উত্সাহ দেখিয়েছিল আমেরিকার লোকরা. তখন থেকেই শুরু হয়েছিল গ্যাস পাইপ লাইন তৈরীর জন্য যুদ্ধ. আমেরিকার জয় হয়েছিল. কিন্তু কাগজে কলমে এই প্রকল্পকে ভাল দেখালেও, তা বাস্তবে তৈরী করা সম্ভব হয় নি. বোধহয়, কেউ বিশ্বাস করেছিল যে, আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা বাহিনীর অপসারণের পরে ও মুজাহেদ গোষ্ঠীর ঠেলায় নাজিবুল্লা সরকারের পতনের পরে এই দেশ আমেরিকার কোম্পানীদের জন্য স্বর্গে পরিণত হবে. কিন্তু আসলে সেখানে শুরু হয়েছিল গৃহযুদ্ধ, প্রত্যেকের, একে অপরের বিরুদ্ধে.

 ফলে মুজাহেদ সরকারের বদল হয়েছিল তালিবদের দিয়ে, যারা ক্ষমতায় এসে সঙ্গে সঙ্গেই গ্যাস পাইপ লাইনের প্রকল্পকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু তালিবদের বেন লাদেনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণেই আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক ভাবে একঘরে হয়েছিল. গ্যাস পাইপ লাইনের প্রকল্পকে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল, আর তা আবার করে শুরু করা হয় ২০০১ সালে, তালিবদের অপসারণের পরেই. আর আবারও প্রকল্পের পথে বাধা তৈরী হয়েছিল বাস্তব জীবনের দিক থেকে. অর্থনৈতিক দিক থেকে সব মিলিয়ে তাপি প্রকল্প সকলের ভাল করলেও, আর তার মধ্য যুদ্ধ দীর্ণ আফগানিস্তান থাকলেও, এই প্রকল্পের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে – আফগানিস্তানের ভিতরেই স্থিতিশীলতার অভাব – যা এখনও দূর করা সম্ভব হয় নি. তাই ওয়াশিংটন খুব সম্ভবতঃ তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে এই প্রকল্পের শুরু হওয়ার জন্য এই এলাকার চারটি দেশকেই সম্বর্ধনা জানিয়ে. আপাততঃ তাপি রয়ে গিয়েছে স্পষ্টই একটা কাগুজে ধারণা মাত্র হয়েই”.

 আমাদের অনুষ্ঠানের অন্য এক অংশগ্রহণকারী আন্দ্রেই গ্রোজিন মন্তব্য করে এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

 “প্রকল্পের ৭৩৫ কিলোমিটার পাইপ লাইন আফগানিস্তানের এলাকা দিয়ে যেতে বাধ্য. এটা একটা সমস্যা তৈরী করে, যা শুধু নির্মাণ নিয়েই নয়, তার নিরাপত্তা নিয়েও. আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ইজিপ্ট ও ইজরায়েলের মধ্যে গ্যাস পাইপ লাইনে বর্তমানে কি হচ্ছে, যা সিনাই নদী পার হয়ে গিয়েছে. সেখানে আজ পাইপ লাইনে বিস্ফোরণ করা হচ্ছে, কাল হচ্ছে গ্যাসের চাপ বাড়ানোর জন্য স্টেশন আক্রমণ. আর আফগানিস্তান, কম করে বললেও, ইজিপ্টের চেয়ে বেশী নিরাপদ নয়. তার ওপরে সেখানে বিক্রেতা (মিশর) কোন মধ্যস্থ ছাড়াই ক্রেতার সঙ্গে আলোচনা করছে – ইজরায়েলের গ্রাহকদের সাথে, তুর্কমেনিস্থান গ্যাস সংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে চলেছে, তারা গ্যাস বিক্রী করছে নিজেদের দেশের সীমান্তে এসে, আর তার পরের সমস্ত দায়িত্ব সহকর্মীদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে. কে এই অশান্ত এলাকায় গ্যাস পাইপ লাইনের সমস্যা সমাধান করবে? বিশেষ করে গ্যাসের জন্য সেনা বাহিনী বানাতে হবে না কি? অথবা আমেরিকার বিশেষ বাহিনী পাঠাতে হবে? এই সবই অবাস্তব ঠেকে. এর মূল কথা হল যে, তাপি প্রকল্প যেমন ছিল, তেমনই থেকে গিয়েছে রাজনৈতিক খেলার কেন্দ্রে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই প্রকল্পকে ইরান- পাকিস্তান – ভারত গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্পের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে. তারা একই সঙ্গে চাইছে তুর্কমেনিয়ার প্রাকৃতিক সম্ভারের উপরে চিনের থাবা আটকাতে. আর শুধু এই কারণেই বেঁচে থাকার অযোগ্য প্রকল্পকে চাপ দিয়ে বের করে আনতে চাইছে. খুবই সম্ভবতঃ, সেটা শুধু কাগজেই থেকে যাবে”.