এক বছরের ওপরে সময় গিয়েছে বিশ্বের “এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী” নিধনের পর থেকে, আমেরিকার সামুদ্রিক নৌবাহিনীর বিশেষ “কম্যান্ডো” দল ২০১১ সালের ২রা মে ভোর রাতে তাকে হত্যা করেছে. কিন্তু ওসামা বেন লাদেন এখন যদি বিশ্বের রাজনীতির গতি প্রক্রিয়াতে কোন বড় রকমের প্রভাব বিস্তার না করেও, তাহলেও আমেরিকা- পাকিস্তানের সম্পর্কে করেই চলেছে. – এই কথা ধ্রুব সত্য.

 কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের আদালত চিকিত্সক শাকিল আফ্রিদিকে ৩৩ বছরের জন্য দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে জেল দিয়েছে. এই চিকিত্সকের দোষ হল যে, সে ২০১১ সালের বসন্তে আমেরিকার “কম্যান্ডো” দলের পাকিস্তানের ভেতরে অপারেশনের কিছু দিন আগে একটা নকল পোলিও রোগের টীকা দেওয়ার শিবির শুরু করেছিল অ্যাবত্তাবাদে বাচ্চাদের জন্য. এই শিবিরের সত্যিকারের উদ্দেশ্য ছিল টীকা দেওয়া নয়, বরং রক্তের নমুনা সংগ্রহ, যা বেন লাদেন ও তার পরিবারের লোক জনকে শনাক্ত করতে সুবিধা করে দিয়েছিল.

 এই ডাক্তার আফ্রিদিকে জেলে দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিরক্তির ঝড় তুলেছে. তা খুবই কড়া সমালোচনা করেছেন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেত্তা (সেই সময়ে তিনি ছিলেন সিআইএ সংস্থার প্রধান). আফ্রিদিকে অবিলম্বে মুক্ত করার দাবী করেছে সেনেট সদস্য জন ম্যাকেইন ও কার্ল লেভিন, যারা এই ডাক্তারের কাজকে বলেছেন “পুরুষোচিত ও দেশ প্রেমী বীরের” উপযুক্ত. ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রত্যেক বছরে পাকিস্তানকে দেয় সাহায্য থেকে ৩৩ মিলিয়ন ডলার করে কম অর্থ দেওয়ার – আফ্রিদির জেলের প্রত্যেক বছরের জন্য এক মিলিয়ন করে কম দেওয়ার.

 এই পরিস্থিতিতে কিছুটা বিসদৃশ লেগেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ঘোষণা, যারা আমেরিকার সেনাবাহিনীর অপারেশনকে সার্বভৌম দেশের সীমানা লঙ্ঘণ করে করাকেই বলেছে “বেআইনি” ও কড়া সমালোচনা করেছে.

 আমরা এখানে ডক্টর আফ্রিদির দোষী বা নির্দোষী নিয়ে প্রশ্নকে এক পাশে সরিয়ে ও সে বিশ্বাস ঘাতক না দেশ প্রেমী দেখতে যাবো না. শেষমেষ, প্রত্যেক দেশই তাদের দেশের নাগরিকদের নিজেদের আইন অনুযায়ী বিচার করার অধিকার রাখে. আর আমেরিকার চোখে “দেশপ্রেমী” শুধু হল সেই সব লোক, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে কাজ করে থাকে. এমনকি যদি তা তাদের নিজেদের দেশের স্বার্থের পরিপন্থী হয় তাহলেও.

 কিন্তু আমরা একটা প্রশ্ন রাখব আমাদের সামনে: কেন এই রায় এখনই দেওয়া হল, আর কেনই এই মামলার চারপাশে এত কোলাহল?

 এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তা করতে হবে বর্তমানের পাকিস্তান- মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রতেই, যার খারাপ হওয়ার জন্য এই অপারেশন খুব একটা কম প্রভাব ফেলে নি, গত বছরের মে মাসে যা করা হয়েছিল, এই কথাই উল্লেখ করে রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “চিকাগো শহরে ন্যাটো শীর্ষবৈঠকের আগে মনে হয়েছিল যে, দুই পক্ষই একটা সমঝোতা খুঁজছে আর তৈরী হয়েছে একে অপরের দিকে কিছু পদক্ষেপ নিতে. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতিকে দেখানো হয়েছে সত্যিকারের খুবই অপমানজনক আপ্যায়ন. রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা তাঁকে আলাদা করে কোন সাক্ষাত্কারই দেন নি, আর ন্যাটো জোটের সাধারন সম্পাদক আন্দ্রেস ফগ রাসমুসেন প্রথমে সেই ধরনের সাক্ষাত্কার ঠিক করেছিলেন, পরে সেটা বাতিল করে দিয়েছেন, অনুষ্ঠানের সূচী খুবই ঘন বলে. আর এটা সব রকম ভাবেই স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আফগানিস্তানের থেকে সেনা বাহিনী প্রত্যাহারের স্ট্র্যাটেজি ও সেই দেশের যুদ্ধ পরবর্তী কালের গঠনের বিষয়ে মার্কিন বা ন্যাটো পক্ষ আর পাকিস্তানের বর্তমানের নেতৃত্বের উপরে নির্ভর করে না – যারা সত্যি দুর্বল ও দেশের বহু সমস্যার সমাধানেই কিছু করার ক্ষমতা রাখে না এবং পরবর্তী সারা দেশ জোড়া নির্বাচনে তাদের সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই কম”.

এর পরে ঘটনা পরম্পরা স্বাভাবিক ভাবেই শুধু জটিলতর হয়েছে. এখান থেকেই এত কড়া রায় বের হয়েছে একটা যথেষ্ট সন্দেহ জনক বিষয়ে. আর এখান থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাগত প্রতিক্রিয়া.

 এখন প্রশ্ন ওঠে: কার জন্য এই ব্যাপারটাকে এত ক্রোধ সম্পন্ন পারস্পরিক দোষারোপে পৌঁছে দেওয়া লাভজনক? আর এমন হবে না তো যে, পাকিস্তানের বর্তমানের সরকারের উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপরে নতুন করে কর্কশ চাপ সৃষ্টি বলে মনে করা হবে?