ভারতের নদী গুলির মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র বলে পরিচিত গঙ্গা – এখন এক খুবই তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক নামে পরিণত হতে চলেছে. সোমবারে প্রত্যেক হিন্দুর জন্যই পবিত্র শহর বেনারসে (কাশী) এক বিশাল মিটিং হয়েছে, যা এই মহান নদীকে রক্ষার জন্য করা হয়েছে – “গঙ্গা মুক্তি মহা সম্মেলন”. এই মিটিংয়ে অংশ নেওয়া মানুষ – হিন্দু পুরোহিত, সাধু ও বিখ্যাত সামাজিক নেতারা – এক ঘোষণা গ্রহণ করেছেন, যাতে প্রশাসনের কাছে দাবী করা হয়েছে নদীকে দূষণ থেকে বাঁচানোর জন্য. তারা একই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, ১৮ই জুন দেশের ২০টি রাজ্য থেকে দশ লক্ষেরও বেশী সক্রিয় কর্মী মিছিল করে দিল্লী অবধি যাবেন, যেখানে এই নদী সংরক্ষণের জন্য নতুন সমাবেশ করা হবে.

 গঙ্গা নদীর উপকূলে চল্লিশ কোটিরও বেশী লোক বাস করেন, অর্থাত্ দেশের জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ. গঙ্গা নদীর জলে স্নান করেন সেই সমস্ত লোকও, যারা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত. এই নদীর জলে অপরিষ্কৃত নর্দমার জল ফেলে দেওয়া হয় বিশাল পরিমানে, আর তারই সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনে মৃত মানুষের অস্থি বিসর্জন দেওয়া হয়ে থাকে (প্রায়ই সম্পূর্ণ ভাবে দগ্ধ না হওয়া অবশেষ, এমনকি একেবারেই দগ্ধ না হওয়া মৃতদেহ পর্যন্ত), - যার ফলে নদীর মধ্য অববাহিকা অঞ্চলেই খুব বেশী রকমের দূষণ দেখতে পাওয়া যায়. আর যখন এই নদী তার গতি পথের শেষে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে পৌঁছায়, তখন তার জলের কাছে আসতেও ভয় করে – এতটাই তা থাকে নোংরা হয়ে.

 গঙ্গা নদী পরিষ্কার করার কাজ – নিঃসন্দেহে, সবচেয়ে ভাল কাজ. ১৯৮৫ সালে ভারত সরকার গঙ্গা রক্ষা করার জন্য একটি কর্মসূচী নিয়েছিলেন, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “বিগত ২০ বছরে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য ২৫ কোটি আমেরিকান ডলারের সমান অর্থ ব্যয় করা হয়েছে. কিন্তু বেশীর ভাগ বিশেষজ্ঞের মতেই, পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয় নি – পরিষ্কার করা হয়েছে শুধু এই নদীর জলে এসে যোগ হওয়া সমস্ত নোংরা জলের একের তৃতীয়াংশ. আর দ্রুত বেড়ে ওঠা জনসংখ্যা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব ও নিজেদের আয়ত্বের মধ্যে থাকা রসদের অনুপযুক্ত ব্যবহারের ফলে সমস্ত শক্তি প্রয়োগের ফলই হয়েছে শূন্য. গত বছরে সরকার নতুন করে পরিকল্পনা তৈরী করেছে ও এমনকি এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ব ব্যাঙ্কের কাছ থেকে একশ কোটি ডলার ধারও পেয়েছে”.

 কিন্তু এখানে হিসাবের মধ্যে আনতে হবে যে একটি দেশের পক্ষে প্রায়ই সমস্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না, বিশেষত, যখন কথা ওঠে সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া নদী নিয়ে. আর ভারত এটা নিজেদের উপরে ভাল রকমেরই টের পেয়েছে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “ব্যাপারটা হল যে, ভারতের ও দক্ষিণ এশিয়ার দুটি মহান নদী সিন্ধু ও গঙ্গাই সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া নদী. ভারত এই দুটির বেশীর ভাগ অংশই নিয়ন্ত্রণ করে, আর গঙ্গা – প্রায় সারা অববাহিকা জুড়েই. তাই যে কোন ধরনের কাজই ভারতের পক্ষ থেকে সিন্ধু ও গঙ্গার উপরের অঞ্চলে করলে, তা প্রতিবেশী দেশ গুলির স্নায়ু বৈকল্যের লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়, - এখানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কথাই হচ্ছে. কিন্তু এই দুই দেশের ক্ষেত্রে “উপরের” দিকের দেশ হলেও, ভারত আবার চিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে “নীচের” দেশ. কারণ চিন গঙ্গার একটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জল সরবরাহের নদীকে নিয়ন্ত্রণ করে – ব্রহ্মপুত্র (তিব্বতে ইয়ারলুং সাঙ্গপো)”.

 বিগত বছর গুলিতে চিন বেশ কিছু বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে নিজেদের দেশের নদী গুলির জলের ধারা পাল্টে দিয়ে দেশের উত্তর – পশ্চিমের খরা কবলিত অংশ গুলিতে পাঠিয়ে – সিনঝিয়ান উইগুর স্বয়ং শাসিত অঞ্চলে, আর তারই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের উপরে জল বিদ্যুত কেন্দ্র এবং বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে ঘোষণা করে. ফলে ভারত নিজেই চিনের কাজকর্মের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, আর পরিবেশ পরিস্থিতি গঙ্গার নীচের দিকে এলাকায় আরও খারাপ হতে পারে, এই সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “পরিস্থিতি আরও এই কারণে জটিল হয়েছে যে, যেমন আন্তর্জাতিক আইনে, তেমনই প্রতিবেশী দেশ গুলির মধ্যে চুক্তি – অধিকারের ভিত্তি এই জল সংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর জন্য উপযুক্ত ভাবে নেই. চিন হয় নিজেদের দেশের নদী গুলি নীচে যে সমস্ত দেশে গিয়েছে, তাদের স্বার্থ সম্পূর্ণ ভাবেই উপেক্ষা করছে, অথবা শুধু শান্ত করার জন্য ঘোষণা করেই ক্ষান্তি দিচ্ছে, নিজেদের হাত বন্ধ করার জন্য কোন রকমের আইন সঙ্গত দলিল তৈরী করতে প্রস্তুত হচ্ছে না”.

 সুতরাং এমনকি যদি ভারত সরকারের নতুন পরিকল্পনা ১৯৮৫ সালের থেকে এবারে বেশী সফল করে বাস্তবায়ন করা হয়ও, তবুও এটা হয়ত গঙ্গা নদীকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট হবে না.