৩৮ - বছর বয়সী শেরুর সারা জীবন কুলুর সাথে জড়িত. ওর জন্ম হয়েছিল বিশাল হিমালয়ের প্রেক্ষাপটে এই অসাধারণ দৃশ্যাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে ছোট্ট পল্লীশহর নাগারে.  তিনি জন্মস্থান ত্যাগ করেছিলেন একবারই সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করার জন্য, তাও হিমাচল প্রদেশেরই রাজধানী সিমলায়. সাংবাদিকতা ও সংবাদ প্রচার মাধ্যমে এম . এ পাশ করার পরে তিনি আবার জন্মভূমিতে ফিরে আসেন এবং রোয়েরিখদের আন্তর্জাতিক ট্রাস্টে কাজ করতে শুরু করেন. আজকাল এমনিতে শান্ত শহর নাগার মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জনাকীর্ণ থাকে. ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, রাশিয়া থেকে, গোটা দুনিয়া থেকেই রোয়েরিখদের স্মৃতিভবন দেখতে আসে তাদের অনুরাগীরা, পর্যটকেরা এবং বছরের পর বছর তাদের সংখ্যা ক্রমঃশই বাড়ছে.

 

শেরু শৈশব থেকেই নহর পল্লীশহরে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে বসবাস করতে আসা চিত্রকর, দার্শনিক, প্রাচ্যতত্ত্ববিদ রোয়েরিখদের সম্পর্কে অনেক প্রশংসামুলক মন্তব্য শুনেছেন তার আত্মীয় - স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে. তিনি জানতেন, যে নব্বইয়ের দশকে পরিবারের সর্বশেষ জীবিত সদস্য চিত্রকর স্ভেতোস্লাভ রোয়েরিখ পরলোক গমন করার পরে ভবনটিকে মিউজিয়ামে পর্যবসিত করা হয়েছে. জানতেন, যে সেখানে সংরক্ষিত আছে বহু হাতে আঁকা ছবি, বইয়ের সংগ্রহ, দুর্মূল্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার সংগ্রহ. আমাদের সংবাদদাতা নাতালিয়া বেন্যুখকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে শেরু বলেছেন, যে রোয়েরিখদের বাসভবন পুণরুদ্ধারের কাজ শুরু হয় ২০০১ সালে আলিওনা আদামকোভা স্মৃতিভবনের তত্ত্বাবধায়কের পদে নিযুক্ত হয়ে আসার পরে. বর্তমানে শেরু আদামকোভার সহকারীর পদে চাকরি করেন.

আমি রোয়েরিখদের স্মৃতিভবনে ৯ বছর ধরে চাকরি করছি. বর্তমানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির সংগঠক ও জনসংযোগ অফিসারের ভূমিকায়. এই সময়ের মধ্যে এখানে সবকিছুর উত্কর্ষতা সাধন করা হয়েছে. এখানে নিয়মিত ভারতীয়, রুশী, ইউরোপীয় চিত্রকরদের আধুনিক সব ছবি প্রদর্শন করা হয়ে থাকে. এরকম প্রদর্শনী ১০০টিরও বেশি আয়োজিত হয়েছে. এখানে বৈজ্ঞানিক সেমিনারেরও আয়োজন করা হয়. সেখানে সারা পৃথিবী থেকে রোয়েরিখদের অনুগামীরা আসে যোগদান করতে. রোয়েরিখ পরিবারের উত্তরাধিকার বহুমুখী . তার মধ্যে আছে এশিয়ার বাসিন্দা বিভিন্ন জাতির কৃষ্টি নিয়ে গবেষণা, তাদের ভাষা, ধর্ম নিয়ে অধ্যাপনা, ঐ এলাকার বনস্পতি ও প্রাণীজীবন নিয়ে চর্চা. এই সব বিষয় নিয়ে সফলভাবে কাজ করেছিলেন পরিবারের কনিষ্ঠরা – ইউরি ও স্ভেতোস্লাভ. পরিবারের কর্তা মহান শিল্পী নিকোলাই রোয়েরিখ ও তাঁর স্ত্রী, ইলেনা রেরিখ, যিনি প্রাচ্যের মুল দর্শন সম্পর্কে বইয়ের রচয়িতা, তাদের রেখে যাওয়া উইল অনুযায়ী নাগারে তাদের স্মৃতিভবনে ইলেনা রোয়েরিখের নামাঙ্কিত কলেজ খোলা হয়েছে. আলিওনা আদামকভার সংস্থায় সবমিলিয়ে ৩৫ জন কাজ করে. আমরা সবাই নিবেদিত সেই কাজে, যে সব রোয়েরিখ পরিবার কুলু উপত্যকার নাগার নামক পল্লী শহরে সম্পন্ন করতে চেয়েছিল.

ইলেনা রোয়েরিখের নামাঙ্কিত শিল্প কলেজ রোয়েরিখদের স্মৃতিভবনের একরকম ভিজিটিং কার্ডে পর্যবসিত হয়েছে. এখন সেখানে পড়াশোনা করে কুলু উপত্যকার ১৫০ জনেরও বেশি ছাত্রছাত্রী. আর সেখানে ভর্তি হতে ইচ্ছুকদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি. বছরে মাত্র ৫০০ টাকা বেতন নেওয়া হয়. ওখানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলা, লোকশিল্প শিক্ষা দেওয়া হয়. কলেজের শিক্ষাসূচি চন্ডীগড়ের প্রাচীন কলা কেন্দ্র নামক শিল্প ইনস্টিটিউট কতৃক অনুমোদিত. স্নাতকরা এম . এ . ডিগ্রি পায়.

শেরু আরও বলছেন, যে সিমলা, দিল্লী, মস্কো, ব্রাজিল, ব্রাতিস্লাভা, স্পেন, এস্তোনিয়া, ইতালি ও অন্যান্য জায়গা থেকে, যেখানেই রোয়েরিখদের অনুগামীরা আছে, তারা এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে রোয়েরিখদের স্মৃতিভবনে মহা ধুমধাম করে উত্সব পালন করে. ঐ দুই উত্সব পালন করা হয় নিকোলাই রোয়েরিখের জন্মদিন ও নিউ - ইয়র্কে ১৯৩৫ সালে স্বাক্ষরিত রোয়েরিখ চুক্তির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে. এই আইনানুগ আন্তর্জাতিক চুক্তির উদ্দেশ্য ও কর্তব্য হল – শান্তিপূর্ণ সময়ে, বিশেষতঃ যুদ্ধের সময়ে শিল্পস্মৃতি সংরক্ষণ করা, যার সাথে বহু দেশই একমত. একে অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে, মানবজাতি ভাবী সব প্রজন্মের জন্য বিভিন্ন যুগের শিল্পীদের সৃজন বাঁচিয়ে রাখতে সমর্থ হবে না. রেরিখদের আধুনিক অনুগামীরা, যারা শিল্পের শিক্ষামুলক ভূমিকার পক্ষে, তারা প্রায়ই নগরে আসে ও এই অভিমত ব্যক্ত করে.

শেরু গত দশকে রোয়েরিখদের স্মৃতি বাসভবনের কর্মকান্ডের আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা উল্লেখ করছেন. মিউজিয়ামটি নিজেই নিজের খরচা মেটায়. উন্নয়নের খাতে সব খরচাপাতি রুশী তত্ত্বাবধায়কের কড়া নজরের মধ্যে থাকে. কলেজ চালানোর খরচা, অধ্যাপকদের বেতন, হিমালয় গবেষণা কেন্দ্র উরুস্বতীর মেরামতিকরন, উত্সবাদির আয়োজন করার খরচা আয় করা হয় সাহিত্য প্রকাশনার মাধ্যমেও. রুশী তত্ত্বাবধায়ক এই কাজে সম্পূর্ণ সফল হয়েছেন – বলছেন শেরু.

শেরু বলছেন, যে ১০ বছর আগেও ভারতে রোয়েরিখদের হাতেগোণা কিছু রচনা প্রকাশিত হয়েছিল. আর আজ ২৫টি বই প্রকাশ করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে প্রবন্ধাবলী, সাহিত্যিক রচনাসমূহ, গবেষণামুলক রচনাবলী. উক্ত তালিকায় আছে নিকোলাই রোয়েরিখের রচনা – ‘অন ইস্টারক্রস রোডস’, ‘ দ্য হার্ট অফ এশিয়া’, ‘ আলতাই - হিমালয়’ . ইলেনা রোয়েরিখের বৌদ্ধ ধর্মের উপর রচনা – বাছাই করা দার্শনিক প্রবন্ধাবলী, ইউরির ‘ সিলেক্টেড ওয়ার্কস ’, স্ভেতোস্লাভের লেখা বই ‘ ডায়েরি নোটস অফ লাইফ এ্যান্ড আর্টস ’. নাগারে আগত অতিথিরা নিজেদের জন্যে, পরিচিতদের জন্যে সাদরে ঐসব বই কেনে. শেরু আরো বলছেন নাগার ভারত ও রাশিয়ার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতীক, যা নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গী গঠণ করতে সাহায্য করে, যাতে ভাবী সব প্রজন্মের জন্য আগের যুগের সভ্যতার সেরা সব সম্পদ অক্ষত রাখা যায়.

শেরু ও রোয়েরিখদের স্মৃতি ট্রাস্টের অন্যান্য কর্মচারীরা আলিওনা আদামকোভার নেতৃত্বে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপণ হওয়ার ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত ফোটো একজিবিশনে অংশ নেন. নয়াদিল্লী থেকে রুশী দূতাবাসের কর্মীরা ঐ প্রদর্শনী নাগারে নিয়ে যায়. সামনে ভারতীয় ও মার্কিনী চিত্রকরদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী, সেন্ট - পিটার্সবার্গের শিশুদের কোরাসের অনুষ্ঠাণ রোয়েরিখদের স্মৃতিভবনে, ইউরোপীয় দেশগুলির ওস্তাদদের ওয়ার্কশপ হতে চলেছে.