প্রথাগতভাবে যারা শিল্পের সমাদর করতে জানে, তাদের থেকে শুরু করে যারা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের সকলের জন্য ১৯শে ও ২০ তারিখ মস্কোয় অনুষ্ঠিতব্য ‘মিউজিয়ামে রাত্রি কাটানো’র সংগঠকেরা ব্যবস্থা করেছে.

      ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু করে এই রাতে ইউরোপের ৪০টিরও বেশি দেশ ঘুমায় না. আর ৫ বছর আগে রাশিয়াও এই উত্সবে সংক্রামিত হয়েছে. এই বছর শুধু মস্কোতেই শিল্প মিউজিয়ামগুলি থেকে শুরু করে বিয়ার মিউজয়াম পর্যন্ত প্রায় ২০০ জায়গায় রাতের উত্সব হবে, যেখানে নগরীর গ্রন্থালয়, পার্ক ও থিয়েটার হলগুলিও যোগ দেবে. তাছাড়াও বেলজিয়াম, আইসল্যান্ড, মিশর ও গ্রীসের দূতাবাস. প্রাচ্যের জাতিদের মিউজিয়াম, যেখানে ভারতের বহু মূল্যবান সামগ্রী আছে, যেমন জগন্নাথ মন্দিরের বাইরের কারুকার্য, প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র, মিনিয়েচার হাতে আঁকা ছবি, যা ১৯১৮ সাল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, সেখানকার উপাধ্যক্ষ তাতিয়ানা মেটাক্সা বলছেন.

    মিউজিয়ামের অন্তর্গত প্রথম সব হলগুলি ভারতের শিল্পের প্রতি উত্সর্গীত. আমাদের ভারততত্ত্ববিদেরা ভারতভ্রমণ করার পরে অনেক বই লিখেছিলেন. বহুবছর ধরে আমরা ভারতীয় মিউজিয়ামগুলির সাথে সহযোগিতা করে আসছি. যেমন, আমরা এখানে এমন প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম, যেখানে ভারতীয় হস্তশিল্পীরা দর্শকদের চোখের সামনে সৃজনশীলতা প্রদর্শন করেছিল.

    এ বছর তাদের শিল্প প্রদর্শন করবে ফুলসজ্জার ওস্তাদরা, ভারতীয় যোগসাধনাকারীরা, নৃত্যক ও সঙ্গীতঙ্গরা. আর এই সবকিছু আয়োজিত হবে বর্ণময় মেলায়, যেখানে থাকবে ভারতীয় মিষ্টি, পোষাক-আষাক, অলংকার. তবে দর্শকরা প্রথমে সেইসব হল পরিদর্শন করবে, যেখানে প্রদর্শনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটবে – দুই জন প্রখ্যাত আধুনিক চিত্রকরের যৌথ প্রদর্শনী – রুশী শিল্পী আলেক্সান্দর তোকারেভ ও ভারতীয় শিল্পী মানস রায়ের চিত্র প্রদর্শনী. ঘটনাটা প্রতীকি. এই বছরে আমাদের দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপণের ৬৫ বছর পূর্তি পালিত হচ্ছে. আর উপোরক্ত দুই চিত্রকরের মধ্যে সম্পর্ক বহুদিন আগে গড়ে উঠেছে, তারা তাদের সৃজনশীলতায় বহুরকম অভিন্নতা খুঁজে পানঃ ছবির গীতিময়তা, শিল্প ঐতিহ্যের মিশ্রণ. এই সব কিছু রহস্যময় নামের ‘রিক্সা-ব্লুজে’ প্রদর্শন করা হবে. সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদী দেশের শ্রমিকদের প্রতীক ছিল রিক্সাওয়ালা, যে খালিপায়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বড়লোকদের ও তাদের বাক্স-প্যাঁটরা টানে. বলছেন আলেক্সান্দর তোকারেভ প্রদর্শনীর ধারনা সম্পর্কে.

     শিল্পীও রিক্সাওয়ালা. সে আরও বেশি ভার বহন করে. সে বয়ে নিয়ে যায় গ্রীক দেবতা অ্যাপোলো ও ভারতীয় দেবতা গণেশ সহ বহু ধর্মের দেবতাদের. যে শিল্পীর আত্মায় ভগবান নেই, সে সত্যিকারের শিল্পী হতে পারে না, বলছেন আলেক্সান্দর তোকারেভ. সেজন্যেই সে তার ভাবনাচিন্তা ও সংশয় নিয়ে দেবতাদের বহন করে যায়. এটা ভারী মাল, কিন্তু মজাদার, কারণ দেবতারা রিক্সায় নাচগানও করে. তাই ঐ রিক্সা টানা আরও কষ্টকর. কখনো ম্লান কখনো ফূর্তির, কিন্তু সর্বদাই আগ্রহদ্দীপক.

মানস রায় তার শিল্পের প্রতি তার কর্তব্য নিজের মতো করে ভাবেন. “মানুষের মধ্যে দুটি মুখ্য পাপ – ঈর্ষা ও রাগ. এর জন্যই সব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে”.

   আমি ছবির ক্যানভাসের আশ্রয় নিই এইজন্যই, যাতে মন থেকে ঐ দুই পাপ সরিয়ে রাখা যায়. আমার ক্ষেত্রে, চিত্রশিল্প হচ্ছে ঝাঁটা, যা সব পাপ পরিস্কার করে দেয়. মানস রায় আরও বলছেন, সাধারণ মানুষের জীবনকে নদীর সাথে তুলনা করা যায়, যা মহাসাগরে গিয়ে মেশে. শিল্পীর জীবন হচ্ছে এমন নদী, যে নিজেই মহাসাগরে পরিণত হয়.

   আলেকসান্দর তোকারেভ বলছেন – “আমরা সম্ভব হলে দার্শনিক আলোচনা করি, গুনগুন গান গাই. চিত্রকরেরা ব্লুজ গায়, যার উত্পত্তি সত্যিই আমেরিকায় হয়েছিল. কিন্তু সেখানে তার বিভিন্ন জাতির শিকড় আছে, ভারতীয় শিকড়ও”. এই প্রসঙ্গে জানাই, রুশী চিত্রকরের আঁকা একটা ছবিতে এক রুশী মহিলার ভারতীয় দেবীদের মতো পাঁচ হাত. আর মানস রায়ের ছবিতে আফ্রিকান সব দেবদেবীর ছড়াছড়ি. সুতরাং আশাই করা যেতে পারে, যে ভারতীয় রাত্রি শেষ হবে আফ্রিকান বাজনা দিয়ে.