বর্তমানের কঠোর বাস্তব আজকাল নিয়মিত ভাবে বহু শতকের অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত জীবনের ঐতিহ্যের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করছে. গত কয়েক মাস ধরে এই ধরনেরই একটা বিরোধ বোধহয় ভারতের প্রায় প্রত্যেক পরিবারই বোধ করেছে: জটিলতা, যা আজ ভারতের অর্থনীতিতে অনুভূত হচ্ছে, তা ভারতের একটি সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্ভারের চাহিদার উপরেই প্রভাব ফেলেছে – তা হল সোনা.

 বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে, যাতে বলা হয়েছে যে, এই বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতে সোনার চাহিদা কমেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় শতকরা ২৯ ভাগ (ওজন হিসাবে). আর এই নিয়ে পরপর দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক চলেছে, যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানী কারক দেশ হয়েছে চিন, ঐতিহ্য অনুযায়ী এই তালিকায় সব সময়েই প্রথমে থাকা ভারত নয়.

 সোনা ভারতীয়দের জন্য এমন এক জিনিস, যা বাদ দিয়ে ভারতীয়দের জীবনযাত্রা চিন্তাই করা যায় না, তা তারা যে সামাজিক স্তরের লোকই হোন না কেন, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “ভারতীয় সমাজের এমন কি খুব গরীব ঘরের মহিলারাও সোনার গয়না পরে থাকেন, আর সোনা দিয়ে তৈরী জিনিস বিয়ের কনের যৌতুকের প্রধান জিনিস হয়ে থাকে, এখানে সেই কথা উল্লেখ না করলেও চলে যে, বহু ভারতীয় লোকই ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখার চেয়ে সোনার জিনিসে নিজেদের সঞ্চয় জমিয়ে রাখতে ভালবাসে, কারণ ব্যাঙ্কের উপরে রুশীদের মতই বিশ্বাস কম”.

 ভারতীয় অর্থনীতিতে যে জটিলতা গত কয়েক মাস ধরে দেখা যাচ্ছে, তা বাধ্য করেছে এই সমস্যার দিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখার. দেশের রপ্তানী খুবই কমে গিয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নতির হার দুই অঙ্কের সংখ্যা থেকে নেমে বিশ্ব মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রায় শতকরা সাত শতাংশ হবে এই বছরের শেষে. স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুয়োরস্ সংস্থা এপ্রিলে ভারতের বিনিয়োগ সূচক স্থিতিশীল থেকে কমিয়ে নেতিবাচক করেছিল. ভারতীয় টাকা আমেরিকার ডলারের তুলনায় দ্রুত তার মূল্য হারাচ্ছে, তা এখন প্রায় ৫৫ টাকায় এক আমেরিকার ডলারের কাছাকাছি হয়েছে. এই ক্ষেত্রে ভারতে সোনা অর্থ বিনিয়োগের পরিমানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রধান আমদানী করা জিনিস, যা শুধু খনিজ তেল ও গ্যাসের পরেই রয়েছে. আর তাই সোনার জন্য খরচ, দেশের অর্থনীতির উপরে খুবই ভারী হয়ে পড়েছে.

 ভারতের সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন এই ভার কমানোর জন্য. সোনার উপরে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে দ্বিগুণ ও তা আমদানী করা সোনার দামের চার শতাংশ হয়েছে. চেষ্টা হয়েছিল যুক্তমূল্য বৃদ্ধির ও গহনা প্রস্তুত কারক ও বিক্রেতাদের বাধ্য করার, যাতে তারা দুই লক্ষ টাকার বেশী দামের যে কোন সোনা কেনার খবর কর বিভাগের কাছে জানায়. কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় স্বর্ণকাররা খুবই দৃঢ় প্রতিবাদ জানিয়েছে ও মার্চ এবং এপ্রিল মাসে তিন দিন ধরে সারা দেশ জুড়ে হরতাল করেছে. ফলে প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যুক্তমূল্য না বাড়ানোর.

 তা যাই হোক না কেন, সমস্যা থেকেই গিয়েছে. আর এই সমস্যা শুধু সোনার ক্ষেত্রেই হয় নি, যত না হয়েছে ভারতীয় অর্থনীতির উপরে সামগ্রিক ভাবে. শুক্রবারে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন সরকারি খরচ কমানোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য. আর যদিও তিনি আহ্বান করেছেন কোন রকমের “বিপদ সঙ্কেত পাঠানোর সুইচ না টেপার জন্য”, তবুও ভারতের বহু অর্থনীতিবিদই মন্ত্রীর এই ঘোষণাকে সেই ঘটনারই সঙ্কেত বলে ধরে নিয়েছেন যে, ভারতের জন্য নতুন সঙ্কটের সময় আসছে, আর দেশের জনগনকে এবারে আরও শক্ত করে কোমর বাঁধতে হবে, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “এই রকমের চিত্রপটে সোনার দাম একটা রেকর্ড সংখ্যায় কাছে রয়েছে আর তা আজ গ্রাম পিছু ২৮০০ টাকা (৫২ ডলারের) কাছাকাছি হয়েছে. আর এর অর্থ হল, গ্রাহকদের এখন খুবই কষ্টকর এক নির্বাচনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে, তা ঐতিহ্য ও হালের প্রয়োজনের মধ্যে দর কষাকষি করে. শেষমেষ, সোনা কোন রুটি, চাল, ডাল, জামা- কাপড়ের মত জিনিস নয়, আর বোধহয়, নিজেদের পরিবার ও দেশের কল্যাণের জন্য বোধহয় এটা বাদ দিলেও চলত. যেমন রুশীদেরও ভাল হত ভোদকা খেয়ে অর্থ নষ্ট না করলে. কিন্তু কি করে এই কঠোর ব্যয় সঙ্কোচের দাবীর সঙ্গে ঐতিহ্যকে মেলানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে সোনাকে মনে করা হয়েছে সবচেয়ে ভরসা যোগ্য ও সবচেয়ে মর্যাদা করার উপযুক্ত সঞ্চয়ের উপকরণ বলে? ভাগ্য ভাল যে, রুশীদের সঞ্চয়ের ঐতিহ্য কোন কালেই ছিল না, তাই কোন সমস্যাও নেই এই প্রসঙ্গে. আর হতেও তো পারে যে, দেশের প্রশাসনের এই ধরনের ব্যয় সঙ্কোচের আহ্বানে উল্টো ফলই হবে: দেশের জনগন নতুন করে নিজেদের সঞ্চয় সোনার জিনিসে রাখতেও শুরু করতে পারে”?

 ভারতের স্বর্ণকাররা যে কোন অবস্থাতেই সন্তুষ্ট থাকবেন বলে মনে হয়. তা আবার এই কারণে যে, ভারতে স্বর্ণকার প্রায় পরিবারের সদস্য. বহু ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে কোন রকমের উপযুক্ত বিল তৈরী না করেই (এটা অবশ্য ভলখোনস্কির কল্পিত বাস্তব, কারণ বিল না হলে এমনকি অশিক্ষিত মহিলারাও পরবর্তী কালে সেই সোনা বিক্রয়ের সময়ে জন্য উপযুক্ত দাম পাওয়া যাবে না বলে, স্বর্ণকার দের বাধ্য করেন বিল দিতে). ভলখোনস্কি মনে করেছেন যে, এই ভাবে বিল না দিয়ে সোনা কেনা বেচার ফলে ভারতের স্বর্ণকাররা কর ফাঁকি দিয়ে থাকেন (এখানে আবারও ভলখোনস্কির উপযুক্ত তথ্যের অভাব প্রকট, কারণ প্রতি গ্রাম সোনাই স্বর্ণকার দের উপযুক্ত কর ও যুক্তমূল্য দিয়ে তবেই কিনতে হয়), আর ভারতীয় পরিবার গুলি তাদের সন্দেহ জনক ও এমনকি বেআইনি উত্স থেকে পাওয়া অর্থকে সোনায় পরিণত করে আইন সঙ্গত করে থাকেন (এখানে আবারও ভারত সম্বন্ধে ভলখোনস্কির সম্যক জ্ঞানের অভাব, যদি বিষয়টি এতই সহজ হত, তবে ভারতে অসাধু লোকদের ঘর বাড়ী খানা তল্লাসী করতে গিয়ে কালো টাকা বা নগদ টাকাও পাওয়া যেত না ও সবচেয়ে দুষ্ট চক্র, যা হুণ্ডি বলে ভারতে পরিচিত, তা অনেক আগেই উঠে যেত).