ভারতে খুবই অস্বাভাবিক এক উত্তপ্ত গণ্ডগোল বেঁধেছে, স্কুলের বইতে এক ষাট বছরেরও বেশী পুরনো কার্টুন চিত্র প্রকাশ নিয়ে. কার্টুনে ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ভারতীয় সংবিধানের একজন অন্যতম লেখক ভামরাও রামজী আম্বেদকরের আদল রয়েছে. এই কার্টুনের শিল্পী – বিখ্যাত কার্টুন শিল্পী শঙ্কর পিল্লাই, যিনি আম্বেদকরকে এঁকেছেন এক শামুকের পিঠে সওয়ারি হিসাবে ও নেহরুকে এঁকেছেন তার পিছনে হাতে চাবুক নিয়ে. এই কার্টুনের সব মিলিয়ে মানে হল যে, সংবিধান সৃষ্টির প্রক্রিয়া খুবই শ্লথ.

 বর্তমানের ভারতের প্রতিষ্ঠাতা ও স্থপতিরা কার্টুনের বিষয়ে খুবই ধৈর্য দেখিয়ে ছিলেন, আর নেহরু এমনকি নিজের পক্ষের লোকদের কাছে দাবী করেছিলেন শঙ্কর পিল্লাইকে রেহাই দিতে, এমনকি যখন তাদের মনে হয়েছিল যে, তিনি সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছেন. তার চেয়েও বেশী হল যে, এই কার্টুন গুলি ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রামের বছর গুলিতে খুব একটা কম ভূমিকা নেয় নি সামাজিক সংজ্ঞা নির্ণয়ের জন্য.

 কিন্তু মনে হচ্ছে, বর্তমানে নেহরু ও আম্বেদকরের কাজের ধারা যারা চালিয়ে যাচ্ছেন, তারা সেই সমস্ত নীতি থেকে অনেক দূর চলে গিয়েছেন, যা দেশের প্রতিষ্ঠাতা স্থপতিরা কার্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন. বিশেষ করে পরিস্থিতিতে তীক্ষ্ণতা তৈরী করেছে সেই বাস্তব, যে, আম্বেদকর ভারতের সমাজের একটি সবচেয়ে নীচু জাতির প্রতিনিধি ছিলেন, অথবা বর্তমানের রাজনৈতিক ভাবে শুদ্ধ ভাষায় যাদের বলা হয়ে থাকে দলিত শ্রেনী, তাদের প্রতিনিধি ছিলেন. আর এর মানে হল যে, স্কুলের বইতে কার্টুন প্রকাশের ফলে, সেই সমস্ত রাজনৈতিক নেতারা, যারা দলিত শ্রেনীর প্রতিভূ, তারাই নিজেদের জন্য এর মধ্যে অপমান খুঁজে পেয়েছেন.

 বিশেষ করে নিজের আবেগ প্রকাশ করেছেন উত্তর প্রদেশ রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য মন্ত্রী ও বর্তমানে রাজ্য সভার সদস্য মায়াবতী, যিনি হুমকি দিয়েছেন যে, রাজ্য সভার কাজ কর্মই বন্ধ করে দেবেন, যদি সমস্ত বই স্কুল থেকে বাজেয়াপ্ত করে না নেওয়া হয়. দেশের পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দল – ভারতীয় জনতা পার্টিও তাঁর থেকে পিছিয়ে নেই. তারা ঘোষণা করেছে যে, সামাজিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু দের অপমান – এটা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের সাধারন ব্যবহার, যারা বিগত দিনেও বহুবার গুজ্জর, জাঠ, শিখ, জিন ও অন্যান্য দের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে দিয়েছে.

 এখানে খুবই ইন্টারেস্টিং হল যে, এই প্রশ্ন নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনার সময়ে কেউই – এমনকি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কোন সদস্যই – বাক্ স্বাধীনতা নীতির রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসেন নি: সবাই একমত হয়েই এই প্রকাশনার সমালোচনা করেছেন, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

 “এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়, প্রথমতঃ, বাক্ স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্বের নীতির প্রতি কি রকম সম্পর্ক থাকা উচিত্. স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, যখন ধর্মীয় প্রতীকের বিষয়ে কথা হয়ে থাকে, তখন শিল্পীদের উচিত্ নিজেদের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা উচিত্, যাতে ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে আঘাত না লাগে. কিন্তু বর্তমানের বিশ্বে অনেকেই এই বিষয়ে ভুলে যান: মনে করে দেখা যেতে পারে, কয়েক বছর আগে সমস্ত “স্বাধীনতা প্রিয়” পশ্চিমের সমাজ শুধু ডেনমার্কের সেই ক্যারিকেচার শিল্পী, যিনি মুসলমান ধর্মের প্রবর্তক মহম্মদকে খুবই ঘৃণ্য ভাবে প্রতিকৃত করেছিলেন, তার সমালোচনা শুধু না করেই ক্ষান্ত থাকে নি, বরং উল্টো – তারই সমর্থনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল.

 কিন্তু যখন কথা হয়ে তাকে কোন ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে, এমনকি খুবই সম্মানীয় কোনও লোকের, তখন বোধহয়. শিল্পীরা নিজেদের বেশী স্বাধীনতা দিতেই পারেন. প্রসঙ্গতঃ, বিবেক ও চরিত্র গত ভাবে শুদ্ধ থাকার প্রশ্ন – খুবই সূক্ষ্ম বিষয়, আর প্রত্যেকেই নিজের জন্য স্থির করে, কত দূরে তাদের এই বিষয়ে সীমানা”.

 ১৯৪৯ সালে এই কার্টুন আঁকা হয়েছিল, বই বেরিয়েছে ২০০৬ সালে. তাহলে এখনই কেন এই স্ক্যান্ডালের উদয় হয়েছে? কারণ- তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক সঙ্কট, যা আজ ভারত টের পাচ্ছে, এই কথা মনে করেন বরিস ভলখোনস্কি, তাই তিনি যোগ করেছেন:

 “স্থানীয় বিভিন্ন নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এক গুচ্ছ পরাজয়ের পরে, অনেক বেশী করেই সেই ধারণা উচ্চারিত হচ্ছে যে, বর্তমানের মন্ত্রীসভা নিজেদের সংবিধান সম্মত শাসনকাল অবধি টিকে থাকবে না, অর্থাত্, ২০১৪ সাল অবধি. আর এর অর্থ হল যে, বিরোধী পক্ষ সর্ব শক্তি দিয়েই সঙ্কটকে ঘনীভূত করতে চেষ্টা করছে ও ২০১৩ সালেই অন্তর্বর্তী নির্বাচন করতে চাইছে”.

 এই দিয়েই – আর তা শুধু দলিত দের প্রতীকের প্রতি সমবেদনা নয় – ব্যাখ্যা করা যায় মায়াবতীর প্রকাশিত আবেগের উত্স কে: যিনি নিজের রাজ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজয়ের পরে খুবই চাইছেন সর্ব দেশের আয়তনে একটা প্রতিশোধ তুলতে, এই রকমই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ. এই দিয়েই সম্ভবতঃ, ব্যাখ্যা করা যেতে পারে প্রশাসনের ও ক্ষমতাসীন দলের পার্লামেন্ট সদস্যদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা: যখন ক্ষমতা হাত থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে, অনেকেই তখন মনে করেন যে, বিরোধীদের সঙ্গে ঝামেলা করে কাজ নেই.