শুক্রবারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দক্ষিণ চিন সাগরে চিন ও ফিলিপাইনসের মধ্যে এলাকা সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করা হয়েছে, দুই পক্ষকেই ধৈর্য প্রকাশ করতে আহ্বান করা হয়েছে ও সমস্ত বিরোধের প্রশ্নের সমাধান একান্তই কূটনৈতিক ভাবে করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে.

 দক্ষিণ চিন সাগরের এলাকা নিয়ে চিন ও ফিলিপাইনসের মধ্যে বিরোধকে স্পষ্টই দ্বিপাক্ষিক বিরোধ হিসাবে দেখা যেতে পারে না. বাস্তবে – এটা নতুন ও শক্তি সঞ্চয় কারী এক ঝোঁক বলেই দেখা যেতে পারে, যা বিশ্ব রাজনীতির বর্তমানে নিকট প্রাচ্য থেকে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে ভূ- রাজনৈতিক মনোযোগের প্রতিস্থাপন করা বলেই মনে করা যেতে পারে. এই বিরোধের মর্মার্থ হল – চিন ও তার প্রতিবেশী দেশ গুলির মধ্যে আলাদা করে কোন ভূমি খণ্ড বা সন্নিহিত সমুদ্র সংক্রান্ত সমস্ত বিরোধই নয় (কার্যত দেখা গিয়েছে যে, তাদের সমস্ত প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই এই ধরনের বিরোধ রয়েছে), বরং তার গভীরতর লুক্কায়িত উদ্দেশ্য হল বিশ্ব রাজনীতির বর্তমানের প্রধান দুই ক্রীড়নকদের – অর্থাত্ চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরস্পর বিরোধী অবস্থান, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা বহু দিন ধরেই বলে আসছেন, - তা এবারে প্রচ্ছন্ন থেকে প্রকট হয়েছে. এই রকমই মনে করে বরিস ভলখোনস্কি, রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বলতে চেয়েছেন:

 “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে খুবই সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে সামরিক ভাবে সহযোগিতা বৃদ্ধির – তারা অস্ট্রেলিয়াতে সামরিক বাহিনী রাখতে শুরু করেছে, ফিলিপাইনসে সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে. আর আগামী বছর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নৌবাহিনীর জাহাজ গুলি ঘাঁটি গেড়ে বসবে সিঙ্গাপুরে, অর্থাত্ মালাক্কা স্ট্রেইট অঞ্চলের একেবারেই সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গায়, যেখান থেকে সহজেই বিরোধের তীক্ষ্ণতা বাড়লে চিনকে বাস্তবে সম্পূর্ণ ভাবেই নিকট প্রাচ্য ও আফ্রিকার খনিজ তেল সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব হবে.

    এই প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে. ব্যাপার হল যে, উপরোল্লিখিত এশিয়া নিয়ে বিশ্ব জোড়া নতুন ঝোঁকের প্রতিসারণ এই অঞ্চলের দুই নেতৃত্ব স্থানীয় দেশ চিনও ভারতের নিজেদের মধ্যে বিরোধেও নতুন করে শক্তি সঞ্চার করছে. তারই মধ্যে দুই পক্ষই, পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক গুলি বিতর্কিত সমস্যা থাকা স্বত্ত্বেও চেষ্টা করছে সব রকম ভাবেই সরাসরি বিরোধ এড়িয়ে যাওয়ার, যা সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সংযোগের নামে করা হচ্ছে. কিন্তু এই বিরোধ কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে না – তা শুধু আরও দূরের কোন মঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর সেখানে উদয় হচ্ছে সম্পূর্ণ শক্তিতেই”.

 চিন বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই ভারত মহাসাগরে সক্রিয়ভাবে অনুপ্রবেশ করতে চাইছে, ভারতকে তার প্রতিবেশী দেশ গুলিতে তথাকথিত মুক্তামালা স্ট্র্যাটেজি নামের সামরিক নৌবাহিনীর উপযুক্ত ঘাঁটি ও লক্ষ্য রাখার কেন্দ্র তৈরী করে ঘিরে ফেলে. ভারত চিনের এই সব কাজের উত্তর দিয়েছে অসমঞ্জস ভাবেই আর সক্রিয় ভাবে দক্ষিণ চিন সাগরের দেশ গুলির সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগ বৃদ্ধি করছে – প্রাথমিক ভাবে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনসের সঙ্গে, অর্থাত্ সেই সমস্ত দেশের সঙ্গেই, যাদের চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমস্যা রয়েছে.

 কিছুদিন আগেই ভারতের দক্ষিণ চিন সাগরে সক্রিয়তা চিনের সঙ্গে সংঘর্ষের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, তাই বরিস ভলখোনস্কি মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন (নিম্ন লিখিত অংশ বরিস ভলখোনস্কির সম্পূর্ণ নিজস্ব তথ্য, সম্পাদকীয় বিভাগ এই বিষয়ে দায়ী নয়):

 “গত বছরের আগষ্ট মাসে ভারতের সামরিক জাহাজ ভিয়েতনামে এক সফর শেষ করে ফেরার সময়ে চিনের নৌবাহিনীর জাহাজ গুলির সামনে পড়ে, তারা ভারতীয় জাহাজকে থামতে বাধ্য করেছিল ও তারপরে ভারতীয় জাহাজ পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল.

 এই বছরের শুরুতে চিন ভিয়েতনামের সঙ্গে যৌথভাবে দক্ষিণ চিন সাগরে খনিজ তেল উত্তোলনের কাজের বিরুদ্ধে খুবই কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল, যা তার একান্তই নিজেদের বলে মনে করেছে. আর মাত্র কয়েকদিন আগেই হিন্দুস্থান সংবাদপত্র, জানিয়েছে যে, ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে খনিজ তেল মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ চিন সাগরের ১২৮ নম্বর ব্লকের উত্তোলন কেন্দ্রের কাজ বন্ধ করার.

    এখানে মনে রাখা দরকার যে, চিন ও ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির মধ্যে আজ তফাত এতটাই বেশী যে, কোন রকমের সামঞ্জস্যের তুলনা চলতেই পারে না. তাই ভারত পরেও স্বার্থ রক্ষার জন্য এই রকমের ও অন্যান্য ধরনের নিজেদের জন্য বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যোগানের জায়গায় পরবর্তী কালে উদয় হবে, তবে সরাসরি চিনের সঙ্গে বিরোধ করতে যাবে না”.

 এখানেই – ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থানের প্রধান তফাত. ওয়াশিংটনের স্ট্র্যাটেজি বিশেষজ্ঞরা ভারতকে নিজেদের নিকটবর্তী সহকর্মী দেশ হিসাবে খুবই দেখতে চেয়েছিল, যাতে চিনকে আটকে রাখা সম্ভব হয়. কিন্তু আপাততঃ নিজেদের পররাষ্ট্র নীতিতে ভারতের প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব ব্যবহারের নীতি বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে. আর ওয়াশিংটনের মনে তো হয় না যে, কোন আশা রয়েছে যে, ভারত নিজেদের পথ ছেড়ে সরে আসবে আমেরিকার নীতির সমর্থনে.