আমরা নিয়মিত কুলু উপত্যকা থেকে খবর পাচ্ছি, যেখানে প্রসিদ্ধ চিত্রকর, দার্শনিক, প্রাচ্যতত্ত্ববিদ রেরিখদের পারিবারিক বাংলো অবস্থিত. ঐ বাংলো দেখাশুনা করে রেরিখদের স্মৃতিতে উত্সর্গীকৃত আন্তর্জাতিক ট্রাস্ট. ঐ ট্রাস্টের তত্ত্বাবধায়কের পদে সারা জীবনের জন্য নিযুক্ত করে গেছিলেন রেরিখ পরিবারের সর্বশেষ প্রয়াত সদস্য চিত্রকর স্ভেতোস্লাভ রেরিখ প্রাচ্যতত্ত্ববিদ ও রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্দর কাদাকিনকে. ঐ ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও রাশিয়ার তরফ থেকে পর্যবেক্ষকের পদে গত ১০ বছর ধরে আসীন আছেন আলিওনা আদামকোভা. হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের প্রশাসন তার সাথে চুক্তির মেয়াদ আর বাড়াতে চায়নি. তাকে তার দায়িত্বভার হস্তার্পণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে.

   ভারতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্দর কাদাকিন রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছেন, যে আদামকোভা পদত্যাগ করার আগে তিনপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষর করা আবশ্যক – ভারত সরকার, রেরিখদের আন্তর্জাতিক ট্রাস্ট ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে, কুলুতে রেরিখদের বাংলোয় দর্শনীয় সব জিনিষের তালিকা ও মূল্য নির্দ্ধারণের বিষয়ে.

       আদামকোভার সাথে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক পরিষদের সাথে আবশ্যকীয় মতবিনিময় না করে. প্রশাসনিক স্তরে সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে. ১০ বছর কর্মকালীন আদামকোভা কুলুতে রেরিখদের বাংলোর মেরামতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাজ করেছেন. ইলেনা রেরিখের নামাঙ্কিত একটা কলেজ খোলা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় ছাত্রছাত্রীরা অধ্যয়ন করে. কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে. নিকোলাই রেরিখের আঁকা ছবির অ্যালবাম, তাঁর স্ত্রী ইলেনার রচনা করা দর্শনভিত্তিক বইপত্র, তাদের পুত্রদের, তিব্বততত্ত্ববিদ ইউরি ও চিত্রকর স্ভেতোস্লাভের রচনাবলী প্রকাশের ক্ষেত্রেও কাজকর্ম সম্পন্ন করা হয়েছিল. ঐ সব রচনাবলী রেরিখদের বাংলো-মিউজিয়ামে আসা ভারত, রাশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ থেকে আসা পর্যটকেরা সাদরে কেনে. রেরিখদের বাংলো হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে. বছরে প্রায় এক লক্ষ লোক সেখানে পরিদর্শন করতে যায়. সেখানে আন্তর্জাতিক কলা উত্সবের, বৈজ্ঞানিক সেমিনারের, সুপ্রসিদ্ধ সঙ্গীতকার ও গায়কদের অংশগ্রহণ সহকারে ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়ে থাকে.

     নয়া দিল্লীতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্দর কাদাকিন আরও বলছেন – আমরা ট্রাস্ট থেকে রাশিয়াকে চাপ দিয়ে বের করার চেষ্টা মেনে নেব না. রুশী পক্ষ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছে, যে কুলুতে রেরিখদের বাংলোকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত পরিস্থিতি আমরা মেনে নিতে পারছি না.        

     রাষ্ট্রদূত কাদাকিন বলছেন, যে আমাদের মতে ট্রাস্টের পরিচালন ভার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়া উচিত. সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফরের সময় এই প্রশ্নটা তোলা হয়েছিল. বিশ্বের মাপের সংস্কৃতি স্মারক, যা ভারত-রাশিয়ার মধ্যে সংযোগে বিশেষ উচ্চমূল্য ধরে রাখে, তা স্থানীয় রাজ্য প্রশাসনের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়.আন্তর্জাতিক রেরিখদের স্মৃতিসম্বলিত ট্রাস্টের কার্যকলাপে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের অংশগ্রহণ – আবশ্যকীয় শর্ত বলে আমরা দাবী করছি. আমাদের প্রস্তাবঃ ২ জন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা – ১ জন ভারতের তরফ থেকে, ১ জন রাশিয়ার তরফ থেকে. রেরিখদের অমূল্য উত্তরাধিকার রাশিয়ার, ভারতের ও সারা বিশ্বের সম্পদ.

     রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের এই মত সমর্থন করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রাক্তন সহকারী সুধীন্দর কুলকার্নি. 

         রেরিখরা আমাদের জন্য অমূল্য উত্তরাধিকার রেখে গেছেন – বলছেন কুলকার্নি. – আমি নিকোলাই রেরিখকে শিল্প আধ্যাত্মের গুরু বলে অভিহিত করবো. তাঁর আঁকা ছবিগুলি, সাহিত্যিক রচনাবলী আমাদের কাছে পৃথিবীর সৌন্দর্য নতুনভাবে উন্মুক্ত করে. তাঁর সাহিত্যিক রচনাবলীতে তিনি ফেওদর দস্তয়েভস্কির বিশ্বাস, যে সৌন্দর্য পৃথিবীকে উদ্ধার করবে, এই অভিমতকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছেন. শ্রী কুলকার্নি আরও বলছেন, যে জীবনের শেষ ২০ বছর চিত্রকর নিকোলাই রেরিখ ভারতে বসবাস করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন. আমরা তাঁর সৃষ্টি করা শিল্পসম্পদের প্রতি অত্যন্ত যত্নের সাথে আচরন করি. ঐ সম্পদের সংরক্ষণ ও জনপ্রচার করে আমরা ভারত ও রাশিয়ার মৈত্রীর দৃঢ় গ্রন্থি আরও শক্ত করি. নিকোলাই রেরিখ ও তার পরিবার এই মৈত্রী দৃঢ়তর করার ক্ষেত্রে বিপুল অবদান রেখেছে. ২০ বছর আগে কুলুতে রেরিখদের বাংলোয় প্রতিষ্ঠিত রেরিখদের স্মৃতিসম্বলিত আন্তর্জাতিক ট্রাস্ট এই অভিমুখেই সক্রিয়ভাবে কাজ করছে. গত ১০ বছরে রুশী তত্ত্বাবধায়ক আলিওনা আদামকোভা রেরিখদের বাংলো-মিউজিয়ামের মেরামতির ক্ষেত্রে অনেক কাজ করেছেন, ইলেনা রেরিখের নামাঙ্কিত শিল্পকলেজ ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে. সারা বছর ধরে এখানে ভারতীয় ও রুশী মঞ্চশিল্পীদের অনুষ্ঠান, চিত্রকরদের প্রদর্শনী আয়োজিত হয়ে থাকে. ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, রাশিয়া থেকে ও গোটা বিশ্ব থেকেই রেরিখের দর্শনের অনুগামীরা এখানে আসে, যা তাঁর ও তাঁর উত্তরসুরীদের সৃজন করা শিল্পসম্পদ সংরক্ষন করতে সাহায্য করে.

0      শ্রী কুলকার্নির মতে উদ্ভুত জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার জন্য মুলতঃ ভারতীয় পক্ষ দায়ী. অতি যত্ন সহকারে ও কৃতজ্ঞতার সাথে ট্রাস্টে রাশিয়ার বিপুল অবদানের মূল্যায়ন করা উচিত, এখনকার তত্ত্বাবধায়কের সৃজনশীল কর্মকান্ডের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত. রাশিয়ার অবশ্যই রেরিখদের ট্রাস্টের কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ চালিয়ে যাওয়া দরকার. এটা আমাদের যৌথ কর্তব্য.