আদাব, প্রিয় বন্ধুরা!

     আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ

     মুসলমান নারীদের সর্বরাশীয় কংগ্রেস – মুসলমান নারী একবিংশ শতাব্দীতে এবং সমাজে তার ভূমিকা. রাশিয়ার মুফতি পরিষদের সভাপতি শেখ রাভিল গাইনুদ্দিনের বক্তব্য.

    তাতারস্তানে আধ্যত্মিক পরিচালন সমিতি কতৃক ২০১২ সালে হজযাত্রা উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠাণ প্রদর্শণ.

   কাজান শহরে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন চতুর্থ ইসলামি অর্থের শীর্ষ বৈঠক.

   অতএব এবার শুনুন আমাদের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠাণ ‘ইসলাম ও মুসলমানেরা’.

      প্রিয় বন্ধুরা, ২৬শে এপ্রিল মস্কোয় আয়োজিত হয়েছিল মুসলমান নারীদের সর্বরাশীয় কংগ্রেস, যেখানে মুখ্য আলোচ্য বিষয় ছিল – মুসলমান নারী একবিংশ শতাব্দীতে ও সমাজে তার ভূমিকা. মুসলিম নারীসমাজের এই সাক্ষাত্কারের উদ্যোক্তা ছিল রাশিয়ার মুফতি পরিষদ ও তাতারস্তানের মুসলিম মহিলাদের সংঘ. কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রক, কুয়েতের ইসলাম ও ওয়াকুফ সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়, ইসলামী সংস্কৃতি গবেষণা তহবিলের পৃষ্ঠপোষকতায়.

    কংগ্রেসে যোগদান করেছিল রাশিয়ার ৫০ টারও বেশি অঞ্চলের মুসলিম নারীরা. তাছাড়াও এসেছিলেন মহিলারা তুরস্ক, আজারবাইজান, কাজাকস্তান, এস্তোনিয়া থেকে. উদ্বোধনী বক্তৃতায় তাদের সকলকে স্বাগত জানান রাশিয়ার মুফতি পরিষদের প্রধান শেখ রাভিল গাইনুদ্দিন. নিজস্ব বক্তৃতায় তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন

          সেই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় প্রথম মুসলমান নারীদের কংগ্রেস আয়োজিত হয়. ঐ কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল পরিবার ও সমাজের প্রতি নারীদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা. সেই সময়ে তারা যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিলঃ তারা শিক্ষা ও সামাজিক আলোকিতকরনের ব্যাপারে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল – বলছেন শেখ রাভিল গাইনুদ্দিন. সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনেও মহিলারা তাদের অবদান রেখেছিল. তাদের মধ্যে অন্যতম অগ্রগণ্য ছিলেন মুহলিসা খানুম বুবি, যিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষিকা, সাংবাদিক, সংস্কারসাধিকা, সামাজিক-ধর্মীয় কর্মী. এই অসাধারান মহিলা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বালিকাদের জন্য মাদ্রাসা ও শিক্ষিকা হতে ইচ্ছুক কিশোরীদের জন্য কলেজ খুলেছিলেন. তিনিই রাশিয়ায় মুসলিম নারীদের শিক্ষালাভের সুয়োগের পত্তণ করেছিলেন.

    রাশিয়ার মুফতি পরিষদের সভাপতির কথায়, আজকের দিনে রাশিয়ার মুসলিম সমাজের শুধুমাত্র শিক্ষিত মুসলিম নারীরই প্রয়োজন নয়, আর দরকার এমন নারীরা, যারা বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারবে, বিশেষতঃ, সমাজের নৈতিক পরিবেশ দৃঢ়তর করতে সমর্থ হবে.

       এই ক্ষেত্রে প্রধান হল আমাদের সন্তানদের মানুষ করা, যারা ভবিষ্যতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যমনি হবে. রাভিল গাইনুদ্দিন বলছেন, ভাবী প্রজন্মকে মানুষ করে তোলা বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় দেশে সহজ কাজ নয়, যখন আমরা হামেশাই আশেপাশে দেখি ইসলাম ও মুসলমানদের বাস্তবিক ইমেজের বিকৃতি ঘটছে. আমরা সমাজে লক্ষ্য করি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আব্রুর প্রতি বিশেষ সম্পর্ক, পরিবারে ও সমাজে মুসলিম নারীদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা ও অনেকক্ষেত্রে কর্মদাতাদের তরফ থেকে বৈষম্য. কিন্তু প্রাজ্ঞতা দিয়ে সন্তানদের গড়ে তোলা ও শিশুদের ও প্রাপ্তবয়স্কদের মুসলিম ধর্মের বুনিয়াদী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে, আমরা রাশিয়ার মুসলমান জাতিগুলির মধ্যে ইসলাম যেন মুখ্য হয় – সেই লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হব.

    রাভিল গাইনুদ্দিনভ  রাশিয়ার মুসলিম নারীদের কেন্দ্রীয় সংঘ গঠণের উদ্যোগ সমর্থন করেছেন. ঐ সংস্থার সভাপতির পদে নির্বাচিত হয়েছেন তাতারস্তানের প্রতিনিধি নাইলা জিগানশিনা.

     মুসলিম নারীদের সংঘ বিভিন্ন অভিমুখে কর্মকান্ড চালাবে. তারমধ্যে আছে পরিবার গঠণ ও তার সংরক্ষণ, কর্মনিয়োগ কেন্দ্র, সেনাসেবীদের মায়েদের সংগঠণ, মুসলমান ডিজাইনারদের সংস্থা, দাতব্য সংস্থা প্রভৃতি.

         এবার রুশী মুসলিম সম্প্রদায়ের খবর জানাই.

     তাতারস্তানের আধ্যাত্মিক পরিচালন সমিতিতে এই বছরে হজযাত্রার বিষয়ে উপস্থাপনা পেশ করা হয়েছে. উপস্থাপন করেছেন সভাপতি মুফতি ইলদুস ফাইজভ. তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যে গত বছরে রুশী হজযাত্রীদের সীমিত সংখ্যা বাড়িয়ে বিশ হাজার পর্যন্ত করা হয়েছে. তারমধ্যে তাতারস্তানের মুসলমানদের জন্য দুই হাজার আসন বরাদ্ধ করা আছে. মুফতি আরও জানিয়েছেন, যে এই বছরে তাতারস্তানের আধ্যাত্মিক পরিচালন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে নিজস্ব হজ-অপারেটর নিয়োগ করা হবে. এর উদ্দেশ্য – সস্তা দরে ব্যাপকহারে বাসিন্দাদের হজযাত্রার সুযোগ দেওয়া, তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো. আশা করা যাচ্ছে, যে তাতারস্তানের অধিবাসীদের গড় মাথাপিছু হজযাত্রার জন্য ৩ হাজার ডলারের মতো খরচ করতে হবে.

          রাশিয়ার মুফতি পরিষদের সামাজিক-দাতব্য দপ্তরের সেচ্ছাসেবীরা দাতব্য তহবিল ‘দান’এর সাথে একত্রে মস্কোর এক পাড়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী এখনো জীবিত সৈনিকদের সাথে দেখা করেছে. স্বেচ্ছাসেবীরা সৈনিকদের জন্য জলসার আয়োজন করেছিল, যেখানে মুলতঃ যুদ্ধকালীন সব গান ধ্বনিত হয়েছে. বৃদ্ধ সৈনিকরা খুশীমনে তাদের যুদ্ধকালীন কৈশোরের গানে গলা মিলিয়েছেন. জলসার শেষে বৃদ্ধ সৈনিকদের বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে স্মারক উপহার দেওয়া হয়েছে.

       চেচনিয়া প্রজাতন্ত্রে একটা মাদ্রাসায় ব্রেইল পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অন্ধদের কোরান পাঠ করা শেখানোর জন্য স্নাতক-শিক্ষকদের প্রস্তুত করা হয়েছে. উত্তর ককেশাসের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী ঐ কোর্স সাফল্যের সাথে শেষ করেছে. একমাস ধরে তাদের কোর্স নিয়েছে চেচনিয়া রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজামাত বিতিরভ, যে তুরস্কে এই পদ্ধতি শিখেছে. শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও থাকা খাওয়ার সব খরচা বহন করেছে মাদ্রাসা.

          উত্তর ককেশাসের ইঙ্গুশেতিয়ায় প্রজাতন্ত্রের পরিসরে প্রথমবার শুদ্ধভাবে আরবী ভাষায় লেখার মেরিট টেষ্ট হয়ে গেল মাদ্রাসার ছাত্রদের মধ্যে. ঐ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ৫টি দল. লিখিত ও কথ্য পরীক্ষাপত্র তাদের জন্য তৈরি করেছিল ইঙ্গুশেতিয়ার আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের বিজ্ঞান ও শিক্ষা কমিটি. জ্যুরিবোর্ডে ছিলেন প্রজাতন্ত্রের প্রখ্যাত ধর্মীয় উপাসকেরা. ইঙ্গুশেতিয়ায় আরবী ভাষার লেখনের শুদ্ধরূপ ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় প্রথম ৩টি স্থান অধিকার করেছে একটি গ্রাম্য মাদ্রাসার ৩টি কিশোর ছাত্র.

         তাতারস্তানের রাজধানী কাজান শহরে একটি অ্যাকুয়া পার্কে ৩০শে এপ্রিল মুসলিম মহিলাদের ‘সুইমিং কস্টিউম’ দিবস পালিত হল. অ্যাকুয়া পার্কের কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে এখন থেকে প্রত্যেক মাসের শেষ সোমবার সেখানে কেবলমাত্র মুসলমান রমনীদেরই প্রবেশ করার অধিকার থাকবে.

    ‘ইসলাম ও মুসলমান’ নামক আমাদের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠাণ আপনারা শুনছেন রেডিও রাশিয়া থেকে.

        প্রিয় বন্ধুরা, আগামী ১৭-১৮ই মে কাজানে চতুর্থ আন্তর্জাতিক ইসলামী বাণিজ্য ও অর্থ শীর্ষক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজিত হবে. বিষয় – রাশিয়া ও ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ সহযোগিতা সংস্থার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা. শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন সংসদের উচ্চকক্ষের উপ-সভাপতি ইলিয়াস উমাখানভ, যিনি মার্চ মাসে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ সহযোগিতা সংস্থার নেতৃবৃন্দের সাথে কাজানে অনুষ্ঠিতব্য শীর্ষ সম্মেলনের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন.  

     আমরা ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতা সংস্থা ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সাথে একত্রে ঠিক করেছি, যে আসন্ন সম্মেলনকে খানিকটা সংসদীয় মর্যাদা দেব, কারণ, রাশিয়ার আইন যদি ইসলামী ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের সাথে খাপ না খায়, তাহলে ব্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয় – বলছেন ইলিয়াস উমাখানভ. কাজানে সম্মেলনে আলোচনা করা হবে মুলতঃ দুটি বিষয় নিয়ে. প্রথমতঃ – অর্থনীতি, আর্থিক সহযোগিতা, এবং সাংসদরা কিভাবে এই ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে. দ্বিতীয়তঃ – বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সংলাপ, মানে কৃষ্টি, মনস্তত্ত্ব, ধর্মীয় প্রাজ্ঞতা কিভাবে বিভিন্ন জাতিকে ঘনিষ্ঠতর করে তুলতে পারে. সুতরাং কাজানে শীর্ষ সম্মেলনে আলোচ্য বিষয়ের সংখ্যাই শুধু বাড়বে না, সম্মেলনের মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে.

    কাজানে ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত হওয়া তিনটি শীর্ষ সম্মেলনেই ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্ক অংশ নিয়েছে. ফলশ্রুতিতে তাতারস্তানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কোম্পানী খোলা হয়েছে. আর সবশুদ্ধ ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্ক গত কয়েক বছরে ২০টার মতো প্রকল্প চালু করেছে, যার মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রকল্পও আছে.

     কাজানে আমরা শুধু আলাপ-আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না, চাই ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সাথে রাশিয়ার আঞ্চলিক ব্যাঙ্কগুলো কিছু বোঝাপড়ায় আসুক. বিশেষতঃ তারা, যারা রাশিয়ায় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সাথে কাজ করতে শুরু করেছে, বা তাদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে. আমার মতে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সাথে একত্রে কাজ করার খুব ভালো পরিপ্রেক্ষিত আছে. সবশেষে ইলিয়াস উমাখানভ বলছেন, যে আমরা এই কাজে সংসদের উচ্চকক্ষকেও জড়াতে চাই.

        প্রিয় বন্ধুরা, ‘ইসলাম ও মুসলমান’ নামক রেডিও রাশিয়া সম্প্রচারিত অনুষ্ঠাণ এখানেই শেষ করছি. আল্লাহ আপনাদের শান্তিতে রাখুন ও আপনাদের মঙ্গল হোক.