আফ্রিকার সমুদ্র তীর থেকে স্বল্প দূরবর্তী সেশেল দ্বীপপূঞ্জ সফর শেষে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল আজ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর এক সপ্তাহ ব্যাপী সফর শুরু করেছেন.

    এই সফর গুলিকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে তাঁর শেষ সফর বলেই দেখা যেতে পারত (তাঁর দায়িত্বভার থাকার সময় শেষ হচ্ছে জুলাই মাসে), বিশেষ করে সেই সব দেশে, যেখানে ভারতকে মিত্র বলেই দেখা হয়ে থাকে, আর তার কোনও রাজনৈতিক অর্থ না করলেও হত. তার ওপরে যখন ভারতের রাষ্ট্রপতি – বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিক চরিত্র ও যেমন মনে করা হয়ে থাকে যে, বড় কোনও ভার রাখে না, অংশতঃ, পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে. কিন্তু বর্তমানের এই শ্রীমতী পাতিলের উপরোক্ত দেশ গুলি সফর স্রেফ সৌজন্য সফরের কাঠামো পেরিয়ে বহু দূর প্রসারী হয়েছে বলে মনে করে স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “সেশেল ভারত মহাসাগরের স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাংশে অবস্থিত – আফ্রিকার শৃঙ্গ ও হিন্দুস্তান উপদ্বীপের ঠিক মাঝামাঝি সমুদ্র পথে, আর তা আবার সোমালির জলদস্যূদের সবচেয়ে সক্রিয় এক এলাকায়.

    জলদস্যূদের সঙ্গে লড়াই বিগত সময়ে বিশ্ব সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে. মনে হওয়া ঠিক ছিল যে, এই লড়াই সমস্ত দেশের জন্যই একই রকমের স্বার্থের প্রশ্ন, কিন্তু বিশ্বের নেতৃস্থানীয় সামরিক নৌবহরের অধিকারী দেশ গুলির জন্য ব্যাপারটা বর্তমানে এই রকমের দাঁড়িয়েছে যে, এই জলদস্যূ মোকাবিলার নামে ভারত মহাসাগরের এই এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার একটা উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তার লক্ষ্য এই লড়াই পার হয়ে অনেক দূর বিস্তৃত.

    ইতিমধ্যেই চিনের “মুক্তামালা” নামের গভীর সমুদ্রের বন্দর তৈরীর নীতি নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হল পারস্য উপসাগর ও লোহিত সমুদ্র থেকে সারা ভারত মহাসাগর দিয়ে চলার পথে বন্দর বানানোর নীতি – যা হয়েছে পাকিস্তানে, কেনিয়ায়, শ্রীলঙ্কায়, মায়ানমারে ও ভাবা হচ্ছে বাংলাদেশেও তৈরী করার. কিন্তু এই স্ট্র্যাটেজির অন্য একটি উদ্দেশ্য হল – ভারতকে সারা সমুদ্র দিয়েই ঘিরে ফেলা. আর এটা দিল্লীতে খুব স্পষ্ট করেই বুঝতে পারা গিয়েছে”.

    গত বছরের শেষে চিন ও সেশেল সমঝোতায় পৌঁছেছে যে, সেখানেও চিনের মালবহনকারী জাহাজ গুলির জ্বালানী ভরার জন্য বন্দর তৈরী করা হবে, যে গুলি পারস্য উপসাগর থেকে ও পূর্ব আফ্রিকা থেকে চিনে যায়. দিল্লীতে এই চুক্তি খুবই উদ্বেগের সঙ্গে দেখা হয়েছে- তার মধ্যে দেখতে পাওয়া গিয়েছে সেখানে নতুন করে চিনের সামরিক ঘাঁটি তৈরীর অভিপ্রায়, বিশেষত ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক এলাকায়. বিশেষ করে রাগের কারণ ছিল যে, সেশেল ভারতের সঙ্গে বহু দিন ধরেই মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ, আর ভারতের নৌবহর সেশেলের সমুদ্র সীমা পাহারা দেয় জলদস্যূ আক্রমণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য.

    ভারতের জন্য বাড়তি সমস্যা সৃষ্টি করেছে আরও একটি দ্বীপপূঞ্জের রাষ্ট্রের প্রশাসনের বদল – মালদ্বীপে. ফেব্রুয়ারী মাসের শুরুতে সেখানে ভারতের প্রতি অনুরক্ত মোহাম্মদ নাশিদ উত্খাত হয়েছেন রাষ্ট্রপতি পদ থেকে, যার ফলে চিনের পক্ষে আরও একটি মুক্তা নিজের মালায় গাঁথার সম্ভাবনা হয়েছে. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “ভারত সেশেলের সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ করতে সক্রিয় হয়েছে. ফেব্রুয়ারী মাসে এই দ্বীপপূঞ্জের রাষ্ট্রপতি জেমস মিশেল দিল্লী সফরে গিয়েছিলেন, যেখানে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও তোলা হয়েছিল. আর এবারে ভারতের রাষ্ট্রপতির পাল্টা সফর হয়েছে সেশেল দ্বীপপূঞ্জে. এই সফরের সময়ে রাষ্ট্রপতি মিশেল ভারতকে জলদস্যূ মোকাবিলার জন্য লড়াইতে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন ও আশ্বাস দিয়েছেন যে, সেশেল ভারতের জন্য এই এলাকায় “ভরসার খাড়া পাহাড়” হয়েই থাকবে”.

    ভারতের রাষ্ট্রপতির দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শুধু শুরু হয়েছে ও তা চলবে পুরো সপ্তাহ. ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা – ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি. বিগত বছর গুলিতে ভারত খুবই নির্দিষ্ট করে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের বিষয়ে আফ্রিকা মহাদেশে বক্তব্য প্রকাশ করেছে, আর এই অঞ্চলের একটি নেতৃস্থানীয় অর্থনীতি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সহযোগিতা – ভারতীয় স্বার্থকে প্রসারিত করার জন্য এক শক্তিশালী এঞ্জিন হতে বাধ্য. তার ওপরে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে যখন সেই ধরনের জোট, যেমন ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) প্রতি বছরের সঙ্গেই ভূমিকা বৃদ্ধি করছে. ব্রিকস গোষ্ঠীর সদ্য বিগত শীর্ষ সম্মেলনে পাঁচটি দেশ ঠিক করেছে নিজেদের নিজস্ব উন্নয়ন ব্যাঙ্ক তৈরী করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে ও তারই সঙ্গে বিশ্ব বিনিয়োগ বাজারে ডলারের প্রভুত্বকে শেষ করবে.

    সুতরাং এই সফরের সময়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী প্রতিভা পাতিল মোটেও আনুষ্ঠানিক কোনও ভূমিকা পালন করতে যান নি.