(এই নিবন্ধের মতামত বরিস ভলখোনস্কির একান্ত ব্যক্তিগত, সম্পাদকীয় বিভাগ এর কোন দায়িত্ব নিচ্ছে না.)   

ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আর তিন মাস বাকী. কিন্তু এখনই প্রশ্ন উঠেছে কে এই পদে আসীন হবেন. সেটাই বর্তমানে ভারতের সংবাদ মাধ্যমের একটি সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়েছে.

    মনে হয়েছিল – এই প্রশ্ন নিয়ে এত সক্রিয় আলোচনার কোনও দরকার আছে কি? কারণ ভারত- পার্লামেন্ট শাসিত গণতন্ত্র, আর এখানে রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটাই আনুষ্ঠানিক চরিত্রের, আর সমস্ত প্রধান প্রশ্ন মন্ত্রীসভায় সমাধান করা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই. তাও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে – মনে করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি:

    “এই কথা সত্য যে, বর্তমানের রাজনীতিতে ভারতের রাষ্ট্রপতির ভূমিকা খুব একটা লক্ষ্যণীয় নয়. কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর উপরেই নির্ভর করে কোন সিদ্ধান্তে শেষ কথা. যদি সারা দেশ জোড়া পার্লামেন্ট নির্বাচনের পরে কোন একটি দলকে অন্যান্য সমস্ত দলের মধ্যে নেতৃস্থানীয় বলে প্রকাশিত না করতে পারে, তবে রাষ্ট্রপতিই ঠিক করেন বড় দলগুলির মধ্যে কোনটি ছোট দলগুলির পক্ষ থেকে সমর্তন যোগাড় করে সরকার গঠনের চেষ্টা করবে. তাছাড়া, রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা ধরেন আইনের খসড়া ফেরত পাঠানোর, আরও একবার পার্লামেন্টে বিচারের জন্য, আর তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলই এই আসনে নিজেদের লোককেই দেখতে চান. শেষে, রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান – এটা একটা নির্দিষ্ট প্রতীক, আর এই ভারতীয় রাজনীতিতে এই প্রতীকের গুরুত্বকে কম করে দেখা সম্ভব নয়”.

    বর্তমানের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী প্রতিভা পাতিলের দায়িত্ব শেষ হতে চলেছে ২৪শে জুলাই. তাঁকে দ্বিতীয় বার আবার নির্বাচনের কোন সম্ভাবনা নেই. আর তা শুধু তাঁর বয়সের কারণেই নয় – তিনি এখন ৭৭, যা ভারতীয় রাজনীতির জন্য খুব একটা বেশী কিছু নয়. প্রধান বাধা হয়েছে – তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে বিগত সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমস্ত পারস্পরিক বিরোধ ও সমস্ত অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে – এটা যেমন বিশাল ঘুষ সংক্রান্ত স্ক্যান্ডাল গুলি, বাজেটের অর্থের প্রভূত পরিমান ও যুক্তিহীন ব্যয় ও আরও অনেক কিছু.

    এখন প্রশ্ন ওঠে: তাহলে কে? ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া যথেষ্ট কঠিন. তাঁকে দেশের পার্লামেন্টের দুই কক্ষের সদস্যদেরই মধ্য থেকে ও রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচক গোষ্ঠী তৈরী করে, তাদেরকে দিয়ে নির্বাচিত করা হয়ে থাকে. তারই মধ্যে আবার আঞ্চলিক পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোটের সংখ্যা অনেক কম, জাতীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের ভোটের চেয়, যা আবার ঠিক করা হয়, প্রতিটি রাজ্যের লোকসংখ্যার হিসাব করে ও বিধানসভায় সদস্য সংখ্যার অনুপাতে.

    গত বছর ও এই বছরের নানা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের খুবই ধ্বংস হয়ে যাওয়া হারের পরে তাদের হয়ে সম্ভাব্য নির্বাচকদের সংখ্যা শতকরা তিরিশ ভাগের বেশী নয়. কিন্তু প্রধান প্রতিপক্ষ – ভারতীয় জনতা পার্টির – তার থেকেও কম মাত্র ২৪ শতাংশ. সুতরাং প্রার্থী নিয়ে সমঝোতায় আসার জন্য দীর্ঘ দিনের প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, নির্বাচকদের সামনে প্রার্থী উপস্থিত করার অনেক আগে থেকেই., - এই রকম মনে করে ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস আপাততঃ তাদের পক্ষ থেকে বাজী ধরেছে বর্তমানের উপ রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি ও অর্থ মন্ত্রী প্রণব মুখার্জির উপরে. কিন্তু এই প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই এই ধরনের কথা উঠছে: যেহেতু রাষ্ট্রপতি – দেশের প্রধান ও সমস্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন, তাই এই পদের প্রার্থী পেশাদার রাজনীতিবিদ হতে পারেন না. প্রসঙ্গতঃ, এটা এই ভাবেই বোঝা উচিত্: ভারতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক নেতা প্রার্থী হতে পারেন না”.

    এই দুই ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে অনেক নাম তোলা হয়েছে. গত বছরে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের চরম পর্যায়ে প্রায়ই অণ্ণা হাজারের নাম করা হত. এখন অন্য এক প্রার্থী উদয় হয়েছেন – এ পি জে আবদুল কালাম, - পদার্থবিদ্যার বৈজ্ঞানিক, ভারতীয় রকেট প্রযুক্তি প্রকল্পের জনক, আগেও তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন ২০০২ থেকে ২০০৭ সালে. অন্যান্য নামও করা হয়েছে – যেমন, ভারতের একটি বৃহত্তম কোম্পানীর কর্ণধার “টাটা” গ্রুপের রতন টাটা, আর এমনকি বলিউডের তারকা অমিতাভ বচ্চনের.

    এখানে প্রয়োজন হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া. ভারতের বর্তমানের রাজনৈতিক দিক নির্দেশের বিষয়ে প্রাথমিক লক্ষণ, যথেষ্ট আনুষ্ঠানিক ভাবে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন করা হলেও, এতে প্রকট হয়ে থাকে. তাই স্পষ্ট যে, অণ্ণা হাজারের নির্বাচনের অর্থ হবে, দেশের রাজনৈতিক উচ্চ মহলের পক্ষ থেকে বদ্ধমুল প্রতিজ্ঞা দুর্নীতি দূর করার বিষয়ে. যেহেতু এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, তাই হাজারের নির্বাচনের সম্ভাবনাও খুবই কম.

    যদি রাষ্ট্রপতি হন রতন টাটা (অথবা ভারতীয় শিল্প বাণিজ্য মহলের অন্য কোনও নেতা), তবে তার অর্থ হবে যে, সমাজ ও রাজনৈতিক উচ্চ মহল অর্থনীতি ক্ষেত্রে দ্রুত বিকাশের পক্ষে.

    কিন্তু আজ, বিশেষ করে “অগ্নি – ৫” রকেটের কয়েকদিন আগের পরীক্ষার পরে, একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে যে, ভারতের জন্য এখন প্রধান কাজ হয়েছে নিজেদের নেতৃস্থানীয় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করা. আর তাই রকেট প্রকল্পের জনক আবদুল কালামের প্রার্থী হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক দেখায়. তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের খুব একটা পছন্দের লোক নন, কিন্তু ভুললে চলবে না যে, দলের এখন মাত্র শতকরা তিরিশ ভাগ ভোট রয়েছে, আর তাদের জনপ্রিয়তা নিয়মিত ভাবেই কমে যাচ্ছে.