মায়ানমার পশ্চিমের জন্য আর মন্দের অক্ষরেখা হয়ে থাকছে না. ইউরোপীয় সঙ্ঘ রেঙ্গুনে নিজেদের প্রতিনিধি দপ্তর খুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ও আগে ঘোষিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একমাত্র অস্ত্র বিক্রয় সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ছাড়া বাকী সব গুলি চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে. এই বিষয়ে ঘোষণা করেছেন ইউরোপীয় সঙ্ঘের পররাষ্ট্র নীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সর্ব্বোচ্চ প্রতিনিধি ক্যাথরিন অ্যাস্টন ২৮ – ৩০শে এপ্রিল তারিখে মায়ানমার সফরের সময়ে.

    গত বিশ বছরের পরে প্রথম ইউরোপীয় সঙ্ঘের নেতৃত্বের মায়ানমার সফর ব্রাসেলস শহরের ঘোষণা অনুযায়ী করা হয়েছে মায়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে সক্রিয়তা শুরু করার জন্যই. ইউরোপের লোকেরা তাদের রাজনৈতিক পরিমার্জনের বিষয়ে সাহায্য করবে ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের বিষয়ে সহযোগিতা করবে.

    একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মায়ানমারের বিরুদ্ধে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য অংশতঃ প্রচেষ্টা হচ্ছে. এর বিনিময়ে এই দেশে আমেরিকার বেসরকারি সংস্থা গুলির কাজকর্ম করার স্বীকৃতী দেওয়া হবে. তারা শিক্ষা, ধর্মীয় যোগাযোগ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গুলির আকার দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করবে.

    এক সপ্তাহ আগে জাপান রেঙ্গুনকে ঋণ সহায়তা দেওয়া আবার শুরু করেছে. এই বিষয়ে টোকিও শহরে মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি উ থেইন সেইন এর সফরের সময়ে ঘোষণা করা হয়েছে. এটা ২৮ বছরের মধ্যে এই দেশের নেতার প্রথম জাপান সফর.

    পশ্চিম ও জাপানের রেঙ্গুনের সঙ্গে এই শান্তি প্রক্রিয়া তারপর থেকেই শুরু হয়েছে, যখন এক বছর আগে জাপানে সামরিক জুন্টা ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল. এপ্রিলের শুরুতে, যখন বিরোধী পক্ষের নেতৃ ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজেতা আউন সান সু চি এই দেশের পার্লামেন্টে প্রথমবার সদস্য নির্বাচিত হতে পারলেন, তখন পশ্চিমে বলা শুরু হয়েছিল মায়ানমারের বসন্ত নিয়ে. তারই মধ্যে বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, গণতন্ত্রের লক্ষণ মায়ানমারে শুধু বাইরেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, জেনারেলরা নিজেদের সামরিক পরিধান ছেড়ে সাধারণের পোষাক শুধু পরেছেন, আর বেশীর ভাগ পার্লামেন্ট সদস্য সেই পার্টির সদস্য, যা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে. একই সময়ে রাজনৈতিক সাইন বোর্ড পাল্টানোয়, আকর তারই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষা নেত্রী আউন সান সু চির “দ্বিতীয় বসন্ত” – এটা খুবই ভাল সুযোগ হয়েছে পশ্চিমের জন্য, যাতে মুখ না লুকিয়ে মায়ানমারে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন খেলা শুরু করার যুক্তি হয়েছে.

    তার ওপরে সেই সময়ের মধ্যেই, যখন পশ্চিম ও জাপান মায়ানমারকে রাজনৈতিক ভাবে একঘরে করে রেখেছিল ও তাদের উপরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পরীক্ষা করে দেখছিল, সেখানের সমস্ত সম্ভাব্য জায়গা চিন দখল করে নিয়েছে. তারা এই দেশে ব্যবহার যোগ্য জিনিসের প্লাবন ঘটিয়েছিল আর রেঙ্গুনের সঙ্গে সামরিক– প্রযুক্তি সংক্রান্ত সহযোগিতা শুরু করেছিল. মায়ানমার হয়ে ভারত মহাসাগরে তারা বর্তমানে পাইপ লাইন পাতছে, যাতে আফ্রিকা ও নিকট প্রাচ্য থেকে খনিজ তেল ও গ্যাস আমদানীকে বিপদ মুক্ত রাখা সম্ভব হয়. এই ধরনের পরিস্থিতিতে পশ্চিম অবশ্যই চেষ্টা করবে চিনের কাজ কর্মকে বাধা দিতে, এই কথা মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর প্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ফেলিক্স ইউরলভ বলেছেন:

    “মায়ানমার বিশাল ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহের উপযুক্ত জায়গা. আমরা আরও... এখানে চিন ও পশ্চিমের প্রভাব সম্প্রসারণের লড়াই দেখতে পাবো. মায়ানমার এর মধ্যেই চিন ও পশ্চিমের স্বার্থ সংঘাতের জায়গা হয়েছে. এই লড়াই আরও জোরদার হবে. কোন সন্দেহ নেই, যে তা হবে বেশ জটিল. এই পরস্পর বিরোধীতা পরে কি আকার নেবে, তা অবশ্য অন্য প্রশ্ন”.

    চিন, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে, নতুন সব আহ্বানের জন্য তৈরী আছে. কিছুদিন আগে তারা মায়ানমারকে আশ্বস্ত করেছে যে, সামরিক- প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করবে. আপাততঃ যখন পশ্চিম শুধু নিষেধাজ্ঞা গুলি নরম করছে, চিন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এর মধ্যেই তৈরী হওয়া চ্যানেল ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাবকে আরও জোরালো করার. বেজিংয়ের উদ্যোগ সমর্থনে এই প্রথমবার চিনের অভিযান বাহিনীর বর্মা যুদ্ধে অংশগ্রহণের সত্তর বছর বড় আকারে পালন করা হয়েছে. আগে গোমিলদানের সময়ের চিনের এই ইতিহাসের পাতা বেজিং ও রেঙ্গুনের মধ্যে সম্পর্কে উত্তেজনা বৃদ্ধিই করত. এখন সমস্যা সরিয়ে ফেলা হয়েছে, আর তার অর্থ হল, আরও একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে মায়ানমারের দাবার ছকে পশ্চিমের সঙ্গে খেলায়.