রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিরিয়াতে সামরিক অপারেশনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা উচিত হবে যদি রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও আরব লীগের বিশেষ প্রতিনিধি কোফি আন্নানের শান্তি পরিকল্পনা কার্যকরী না হয় তাহলে. এই বিষয়ে ফরাসী কূটনৈতিক দপ্তরের প্রধান অ্যালেন জ্যুপে ঘোষণা করেছেন.

    এই ঘোষণা সেই মুহূর্তেই করা হয়েছে, যখন কোন ভাবেই বাদ না পড়ে যাওয়া সমস্ত উত্সই (তার মধ্যে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষের উত্সও রয়েছে) লক্ষ্য করেছে দামাস্কাস ও বিরোধী পক্ষের একাংশের তরফ থেকে “আন্নানের পরিকল্পনা” মেনে নেওয়ার পরে সিরিয়াতে হিংসার মাত্রা অনেকটাই কমে যাওয়ার চিহ্ন. কিন্তু প্যারিসে, মনে হচ্ছে, এই বাস্তব ঘটনা মেনে নিতে চাওয়া হচ্ছে না. প্রসঙ্গতঃ, শুধু এটা প্যারিসেই নয়. একই ধরনের সুর বাজছে পশ্চিমের আরও অনেক দেশের রাজধানীতে, আর তারই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের কিছু আরব দেশে.

    এটা কিভাবে শেষ হতে পারে? এই বিষয়ে নিজের ধারণা “রেডিও রাশিয়াকে” ব্যাখ্যা করে এই এলাকা সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর নাদেইন-রায়েভস্কি বলেছেন:

    “সিরিয়া সম্বন্ধে বিগত কিছু সময়ে পশ্চিম নিজেদের স্বর কিছুটা মৃদু করেছে. বাশার আসাদকে ক্ষমতা ছেড়ে সরে যাওয়া নিয়ে দাবী কিছুটা কম করা হচ্ছে. কিন্তু বর্তমানের সিরিয়ার প্রশাসন ভেঙে দেওয়ার স্বপ্ন পশ্চিমের রাজনীতিবিদ ও সামরিক বাহিনীর লোকদের হৃদয়ে বেঁচেই আছে. গত সপ্তাহে ব্রাসেলস শহরে থাকার সময়ে পেন্টাগনের প্রধান লিওন প্যানেত্তা সিরিয়া নিয়ে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন: “যদি আন্তর্জাতিক সমাজ সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে, আমরা এটা নেওয়ার জন্য তৈরী থাকবো”. এটা ছিল প্রথম ইঙ্গিত সেই বিষয়ে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোটের লোকরা আন্নানের পরিকল্পনাকে দেখছে একটা সাময়িক অপছন্দের অসুবিধা বলে – আর সামরিক ভাবে অনুপ্রবেশের জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে. অ্যালেন জ্যুপের ঘোষণা-নতুন করে আবার সমর্থন করেছে সেই বিষয়ে যে, এই মত ইতিমধ্যেই প্রধান পশ্চিমের সহকর্মীদের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে. আর সিরিয়ার লোকেদের মতামত তাদের প্রয়োজন নেই – ঠিক করে বলতে হলে, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় হল সেই সব সিরিয়ার লোকদের মতামত, যারা পশ্চিমের যুক্তির পুনরাবৃত্তি করে. বেশীর ভাগ সিরিয়ার বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিত্ব মূলক সংস্থা- তা যেমন মধ্য পন্থী, তেমনই যথেষ্ট চরমপন্থী – তাদের নিজেদের দেশের বিষয়ে বিদেশের সামরিক অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে. কিন্তু পশ্চিমের যুদ্ধের পক্ষের লোকদের, মনে হয়েছে, এই বিষয়ে কোন জানার উত্সাহ নেই. পশ্চিমের রাজনীতিবিদদের একেবারেই পছন্দ হয় না সেই ধরনের রাষ্ট্র, যারা নিজেদের আত্ম নির্ভরশীল রাজনীতি পালন করে চলে. তাদের পক্ষে বেশী ভাল হত যদি সেই সব দেশের নেতারা এমন সব লোক হন, যারা কথা শুনে চলবে, অথবা যদি এই সব দেশে একেবারেই ভেঙে পড়ে, যদি তা আইন সঙ্গত ভাবে নাও হয়, তবে বাস্তবে অন্তত, সেই রকমের, যেমন এটা ঘটেছে ইরাকে ও লিবিয়াতে. সিরিয়ার জন্য স্পষ্টই এই রকমের ভবিষ্যত ভেবে রাখা হয়েছিল – কিন্তু দেশ বাধা দিচ্ছে, আর পশ্চিমে এটা নিয়ে, মনে হয়েছে, খুবই অসুখী.

    ভিক্টর নাদেইন-রায়েভস্কি যা বলছেন, সেই ধরনের দৃষ্টিকোণের সঙ্গে একমত হওয়া কি সম্ভব? এই প্রসঙ্গে সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ বলেছেন:

    “সবচেয়ে ভাল হয় বাস্তবের দিকে দৃষ্টিপাত করলে. ঠিক এক বছর আগে ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্র কূটনৈতিক দলিল পত্রের তথ্য থেকে পাওয়া খবর বলে জানিয়েছিল যে, ২০০৬ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে সাহায্য করা শুরু হয়েছিল. এই অর্থ সাহায্যের একাংশ খরচ করা হয়েছিল উপগ্রহ মারফত টেলিভিশন চ্যানেল “বারাদা টিভি” তৈরী করার জন্য, যা বিরোধী পক্ষের লোকরা চালাতো, যারা কখনোই লুকোয় নি যে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হল- বর্তমানের মন্ত্রীসভার পতন. এই টেলিভিশন চ্যানেল খুবই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল গত বছর থেকেই. তারই মধ্যে, ২০০৭ সালেই ইউরোপে ন্যাটো জোটের সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন প্রধান ওয়েসলি ক্লার্ক এক আগ্রহ জাগানো স্বীকারোক্তি করেছিলেন. তাঁর কথামতো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের পর থেকেই নিজেদের “বশে নিয়ে আসার” জন্য সাতটি দেশ নিয়ে পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে. এটা ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরান, লেবানন, সুদান ও সোমালি. এই পরিকল্পনা ২০০৩ সাল থেকে বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে ইরাকে মার্কিন সেনা বাহিনীর অনুপ্রবেশ দিয়ে. তারপরে তা কিছুটা ঠোক্কর খেয়েছে, এর কারণ মনে করা যেতে পারে যে, আফগানিস্তানে দীর্ঘসূত্রী যুদ্ধের কারণে. কিন্তু গত বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ন্যাটো জোটের সহকর্মীরা লিবিয়াতে সামরিক অপারেশন চালিয়েছে. বাকী দেশ গুলি, ভাবা উচিত্ যে, কেউই এই তালিকা থেকে বাদ দেয় নি. যদি সিরিয়া নিয়ে বলতে হয়, তবে আপাততঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোট সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে সহায়তা করা দিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছে, তার সঙ্গে যোগ করেছে প্রচার যন্ত্র ও নিষেধাজ্ঞা. তা স্বত্ত্বেও এই পরিকল্পনা, যা নিয়ে আমেরিকার জেনারেল বলেছিলেন, তা মনে হচ্ছে এখনও চালু রয়েছে. তাই সিরিয়ার চারপাশ জুড়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন নিয়ে পূর্বাভাস- সবচেয়ে উদ্বেগ জনক”.