বৃহস্পতিবারে পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট বহু প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছে, প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানির মামলা নিয়ে. তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল আদালত অবমাননার জন্য ও আদালতের সিদ্ধান্ত না পালন করার জন্য. প্রধানমন্ত্রীর ছয় মাসের কারাদণ্ড পর্যন্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল. কিন্তু যদিও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তবুও তাঁর কারাদণ্ডের মেয়াদ ঘোষণা করা হয়েছিল শুনানী শেষ হওয়া পর্যন্ত, যার মেয়াদ ছিল মাত্র তিরিশ সেকেন্ড.

    মনে করিয়ে দেবো যে, "গিলানি মামলা" তার মূলে ১৯৯০ সালের ঘটনায় রয়েছে. তখন প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন বেনজির ভুট্টো, আর তাঁর স্বামী, বর্তমানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি, এক গুচ্ছ মন্ত্রী পদে বহাল থেকে অভিযুক্ত হয়েছিলেন ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য ও বড় ব্যবসায়ের কাছ থেকে ঘুষ এবং টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য. জারদারি এমনকি একটি ডাক নাম পেয়েছিলেন “জনাব দশ টাকা” (শতাংশ) বলে.

    ২০০৩ সালে জারদারি ও বেনজির ভুট্টো সুইজারল্যন্ডের আদালতের বিচারে কালো টাকা পাচারের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন. তাঁরা সেই সময়ে ছিলেন পরবাসে, আর পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফের নেতৃত্বে ছিল সামরিক প্রশাসন.

    কিন্তু ২০০৮ সালে, যখন প্রশাসনের ক্ষমতা দ্রুত মুশারফের পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছিল, তখন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর লোকরা ঠিক করেছিলেন এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে অসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়, তার মধ্যে সেই সমস্ত নেতাও ছিলেন, যাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল. এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই বহু অভিযুক্তের সম্বন্ধে দোষ মকুবের কথা ঘোষণা করে হয়েছিল, তার মধ্যে বর্তমানের রাষ্ট্রপতি জারদারিও ছিলেন.

    কিন্তু ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট এই দোষ মকুব ঘোষণাকে অস্বীকার করে ও রাষ্ট্রপতি জারদারির বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্তের আদেশ দেয়, প্রধানমন্ত্রী গিলানির নেতৃত্বে প্রশাসন বাস্তবে এই আদালতের সিদ্ধান্তের পথ রোধ করে দাঁড়ায়, আর সেই ক্ষেত্রে উল্লেখ করে যে, রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান হিসাবে আদালতের রায়ের ঊর্ধ্বে এক ধরনের স্বাধীনতার অধিকার রাখেন.

    এই সমস্ত ইতিহাস যার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে, মনে করিয়ে দেয় এক দাবা খেলার কথা – এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “সত্যিকারের আক্রমণ করা হয়েছে রাজাকেই (এই ক্ষেত্রে- রাষ্ট্রপতি). কিন্তু আপাততঃ, নিজেদের উপরে আঘাত গ্রহণ করছে অন্যান্য ঘুঁটি, যারা সব রকম ভাবে চেষ্টা করছে প্রধানকে রক্ষা করতে. এর পরে পরিস্থিতি কি হতে চলেছে, তা আপাততঃ বলা কঠিন. প্রথমতঃ, বৃহস্পতিবারে বিচার সভায় রায়ের অংশই পড়ে শোনান হয়েছে, পুরোটা বলা হয় নি, সমস্ত রায় পরে বের হবে. এই রায়, যা পড়া হয়েছে, তার থেকে বোঝা যাচ্ছে না, এর মানে প্রধানমন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে সরাসরি তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে বলা হবে কি না. এটা হতে পারে যদি প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের সংবিধানের ৬৩ নম্বর ধারার প্রথম (জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন বলে বলা হয়. কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের দেওয়া রায়ে শুধু এই ধারার কথা বলা হয়েছে পাশ কাটিয়ে, আর এই প্রকাশিত রায় থেকে বোঝা যাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রী এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দোষী হয়েছেন কি না”.

    এই রায় দেওয়ার ঠিক পরেই গিলানি তাঁর মন্ত্রীসভার জরুরী বৈঠক করেছেন ও তাঁর সমস্ত সমর্থকদের সেই সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন, যা তিনি এই মামলা চলার সমস্ত সময় ধরেই অনুভব করেছেন. প্রধানমন্ত্রীর উকিলরা ইতিমধ্যেই এই রায়ের বিরুদ্ধে পিটিশন করবেন বলে জানিয়েছেন.

    কিন্তু বাস্তবে মনে করা যেতেই পারে যে, গিলানির এবারে প্রধানমন্ত্রী থাকার দিন হাতে গোনা যায়, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “শুধু এই টুকুই উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তাঁর এই শক্ত ভাবে নিজের অবস্থানে বজায় থাকা এক ধরনের মর্যাদা অনুভব করায়: গিলানি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে এর জন্য বাঁধা দিয়েছেন ও শেষ অবধি জারদারির উপরে আক্রমণ ঠেকিয়ে গিয়েছেন. আর এটা করেই, যদি দাবার সঙ্গে তুলনা করা যায় তবে তিনি যথার্থ ঘোড়ার মতো শক্তিশালী ঘুঁটির কাজই করেছেন. যাকে ইংরাজীতে নাইট বা বীর বলা হয়ে থাকে.

    কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবে গিলানির অবশ্যম্ভাবী পদত্যাগের অর্থ হবে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জীবনে নতুন মোড়. এবারে প্রায় কোন রকমের বাধা ছাড়াই দাবার রাজা – অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি জারদারির পরে আক্রমণ করা যাবে. তিনি বাস্তবে সেই পরিস্থিতিতে কোন রকমের ঢাল বিহীণ হয়ে যাবেন, যখন বর্তমানের প্রশাসনের জনপ্রিয়তা দেশে খুবই কম হয়েছে ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত মতবিরোধ রয়েছে, আবার তার ওপরে দেশের বিচারালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মত দিচ্ছে”.

    আরও একটি বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, বর্তমানের পরিস্থিতিতে খুবই অসম্ভব মনে হয়েছে বিশেষ ধরনের কোন রকমের সমর্থন ওয়াশিংটনের বড় কমরেডদের কাছ থেকে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক, এমনিতেই ভাল হওয়ার আশাই শুধু রাখে.