ট্রান্স ন্যাশনাল বা বহু দেশের সীমানা পার হওয়া অপরাধ প্রতি বছরে দুই লক্ষ দশ হাজার কোটি ডলার রোজগার করে, আর এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তরের প্রধান ইউরি ফিদোতভ. এটা দেশ গুলির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিকাশের পথে অন্তরায় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন. তারই মধ্যে বিশ্ব জোড়া অপরাধের সঙ্গে লড়াই করার ব্যবস্থা আপাততঃ খারাপই কাজ করছে, বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা.

    বর্তমানে সংগঠিত অপরাধের বাত্সরিক আয় গ্রেট ব্রিটেনের গড় বার্ষিক আয়ের চেয়ে সামান্য কম. যদি এই সব মাফিয়া গোষ্ঠী এক দেশেই নিবদ্ধ থাকতো, তবে তা বিশ্বের বড় কুড়ি অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী দেশের একটি হতে পারতো. এই ধরনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে ২০০৯ সালে. অপরাধ জগত রোজগার করছে মাদক দ্রব্যে, অস্ত্র ব্যবসায়, “মানুষ পাচারে ও পতিতা বৃত্তিতে”, ধনী হচ্ছে লোক ঠকিয়ে, লুঠ করে, কম্পিউটার ব্যবহার করে চুরি করে. ইউরি ফিদোতভের কথামতো, শুধু বাধ্য হওয়া নারী দেহ বিক্রী থেকে গুণ্ডা নেতারা বছরে তিন হাজার দুশো কোটি ডলার আয় করে. আর উন্নতিশীল দেশের দুর্নীতি করা লোকেরা সমাজের কাছ থেকে প্রতি বছরে প্রায় চার হাজার কোটি ডলার “ঘুষ” হিসাবে আদায় করছে.

    রাষ্ট্রসঙ্ঘে “ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রসঙ্ঘ” নামে এক প্রকল্প রয়েছে, যেটা মাদক দ্রব্য ও অপরাধের মোকাবিলা আর শান্তি রক্ষা ও বিকাশের সমস্ত রকমের উদ্যোগকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তৈরী. তা স্বত্ত্বেও আপাততঃ রাষ্ট্রসঙ্ঘ বেশীর ভাগ সময়েই ঘটনার পরম্পরা নথি বদ্ধ করার কাজই করছে, এই রকম মনে করে রাশিয়ার লোকসভার নিরাপত্তা ও দুর্নীতি প্রতিকার পরিষদের সদস্য বরিস রেজনিক বলেছেন, “আমি মনে করি রাষ্ট্রসঙ্ঘের কোন সত্যিকারের প্রতিক্রিয়া করার মতো ব্যবস্থাই নেই. এটা করার কথা জাতীয় প্রশাসনের, তাদের সমস্ত রকমের দুর্নীতির প্রকাশের সঙ্গেই লড়াই করার মতো অস্ত্র রয়েছে”.

    সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে লড়াই করা উচিত্ বিশ্ব জোড়া বাহিনী, এই রকম মনে করেন রাশিয়ার ইন্টারপোল ব্যুরোর প্রাক্তন ডিরেক্টর ভ্লাদিমির অভচিনস্কি. সংগঠিত অপরাধ, এটা যেমন একদিকে চুরি ও ডাকাতি, আর তেমনই অন্য দিকে অর্থনৈতিক অপরাধ, দুর্নীতি, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ. এই সব কিছুকেই এক সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে শুধু বিশ্ব জোড়া কোন কাঠামো, উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞ. অভচিনস্কি বলেছেন যে, রাশিয়াতে এই কাঠামো রয়েছে ও তারই সঙ্গে যোগ করেছেন:

    “আমাদের ইন্টারপোল খুবই ভাল কাজ করে. রাশিয়ার ইন্টারপোল সেই ১৯৯০ সালের শেষ দিকেই “মিলিয়েনিয়াম” নামে এক প্রকল্প চালু করেছিল, যার কাজ ছিল প্রাক্তন সোভিয়েত দেশের এলাকায় ও পূর্ব ইউরোপে অপরাধ উদ্ভূত অর্থের চলাফেরা নজরে রাখা. আমাদের সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে, যা সমস্ত বিশ্ব অর্থনৈতিক অনুসন্ধান কাঠামোর সঙ্ঘে যোগ করা. আমাদের কাছে ইন্টারপোলের মাধ্যমে যোগাযোগ করার উপায় রয়েছে ইউরোপোলের সঙ্গে. কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, যাতে এই সব কাঠামো একই ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে”.

    প্রায়ই সমস্যা হয়ে যায় শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে, এই রকম মনে করেন লোকসভা সদস্য বরিস রেজনিক. প্রায়ই দুর্নীতির কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন দেশ জুড়ে যায়, কিন্তু তাদের প্রশাসন, খুবই খারাপ কাজ করে অপরাধ মোকাবিলার ক্ষেত্রে. বিশাল দুর্নীতি করা মাফিয়া আছে ইতালি, স্পেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এই সব দেশে, কিন্তু মাফিয়াদের বড় মাপের ধরপাকড় হচ্ছে খুবই কম. তাই বিশেষজ্ঞ বলেছেন:

    “দুর্নীতি বাজ লোকদের যখন ঘোলা জল থেকে বার করে আনা হয়, তখন তারা নিজেরাই বিপজ্জনক হয়ে পড়ে. প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঠগদের একটা যোগ সাজশ থাকে, যারা ভয় পেয়ে যায় যে, এই সব অপরাধীদের কাঠগড়ায় চড়ালে, তারা নিজেদের সঙ্গে সুতো নয় একেবারে মোটা দড়ির মতো সমস্ত গোপন ধান্ধাবাজদেরই বার করে আনবে”.

    অপরাধীরা নিজেদের আয় অপরাধের জায়গা থেকে দূরে কোথাও লুকিয়ে রাখে. সুইজারল্যন্ডের ব্যাঙ্ক মালিকরা, যারা এক সময়ে খুবই ইচ্ছুক ভাবে নাত্সীদের কাছ থেকে টাকা ও গয়নাগাছি নিয়ে জমিয়ে ছিল, তারাই এখন এই সব অপরাধ থেকে উত্পন্ন শত কোটি ডলার লুকোতে সাহায্য করছে. এই সব গুণ্ডাদের কাছে লোভনীয় হয়েছে লিখটেনস্টাইন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও এমনকি প্রায় “জীবাণু মুক্ত” জার্মানীতে থাকা ব্যাঙ্ক গুলিও. “কালো” টাকা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে পার হয়ে যাচ্ছে. অনেক অপরাধ থেকে উপার্জিত অর্থকেই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না, বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এই কথা. “রাশিয়ার অর্থ, যা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, প্রায় সম্ভবই হয় না দেশে ফেরানো, কারণ আপাততঃ এই অর্থ ফিরিয়ে আনার মতো কোনও আইন সঙ্গত ব্যবস্থা নেই” – এই কথা বলেছেন জাতীয় দুর্নীতি মোকাবিলা পরিষদের সদস্য পাভেল জাইতসেভ. সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সঠিক স্ট্র্যাটেজি বহু দেশেরই দরকার. আপাততঃ ইউরি ফিদোতভ তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন এই বলে যে, অপরাধী সংগঠন গুলি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সঙ্গে খুবই “লক্ষ্যণীয় মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা” প্রদর্শন করছে.