মাত্র তিন বছর আগে যে শ্রীলঙ্কায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছে, সেখানে আবার নতুন প্রজাতি ও ধর্ম মতের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে. শুক্রবারে দাম্বুল্লা শহরে এক দল লোক ভীড় করে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে এক মসজিদের সামনে উপস্থিত হয়েছিল, তারা মুসলমানদের শুক্রবারের নামাজ পড়ায় বাধা দিয়েছিল. মুসলমানরা বাধ্য হয়ে অনেক সময় ধরে এই মসজিদের ভিতরে আটকে থাকে. আর শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের ভোরে এই মসজিদের ভিতরে মলোতভ ককটেল ছোঁড়া হয়েছিল. স্রেফ ভাগ্যের জোরে কেউ হতাহত হন নি.

    শ্রীলঙ্কা সরকারের ডাকা জরুরী অধিবেশনে এই গত সপ্তাহের শেষে ঠিক করা হয়েছে মসজিদ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, কারণ তা বেআইনি ভাবে তৈরী করা হয়েছে বলে, ভাবা হয়েছে.

    এই সমস্যার মূল কোথায়? দাম্বুল্লা – শ্রীলঙ্কার অধিকাংশ বৌদ্ধ জনতার জন্য এক পবিত্র তীর্থস্থান. সেখানে গিরি কন্দরে মন্দির রয়েছে, যা আমাদের সহস্রাব্দ পূর্বের প্রথম শতকে এই দ্বীপে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাথমিক অবস্থানের প্রমাণ. এটা একই সঙ্গে একটি সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য পর্যটন কেন্দ্রও বটে. ১৯৮২ সালেই শ্রীলঙ্কার সরকার এক বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, যার ফলে এই দাম্বুল্লা এলাকা বৌদ্ধদের জন্য তীর্থস্থান ও একই সঙ্গে এখানে বৌদ্ধ ছাড়া অন্য যে কোনও ধর্মীয় স্থান সৃষ্টি করা বারণ হয়েছে.

    কিন্তু ব্যাপার হল যে, মসজিদ এই এলাকাতে রয়েছে এই নতুন সিদ্ধান্তের অনেক আগে থেকেই, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি তাঁর ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করে বলেছেন:

    “এই মসজিদ তৈরী করা হয়েছিল ১৯৬২ সালে. এখন দাম্বুল্লা এলাকায় যারা মসজিদের বিরুদ্ধে, তারা বলছেন যে, কিছুদিন আগে এর এলাকা বেআইনি ভাবে বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ, ব্যাপারটা শুধু একটা মসজিদ ঘিরেই নয়, বিগত কয়েক মাস ধরে শ্রীলঙ্কায় স্পষ্ট করে দেখতে পাওয়া গিয়েছে ধর্ম ও প্রজাতি গত দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার লক্ষণ – সিংহলী বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দের সঙ্গে মুসলমান সংখ্যালঘিষ্ঠ দের, যাঁরা মোট জনসংখ্যার মাত্র শতকরা সাড়ে সাত ভাগ. গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অন্য একটি বৌদ্ধ তীর্থস্থান ও পর্যটন কেন্দ্র অনুরাধাপুরে – এক ভীড় করে আসা লোকের দল আবারও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে একটি মুসলিম ধর্মীয় স্থানকে অপবিত্র করেছিল.”

    শ্রীলঙ্কা এখনও ২৫ বছর ধরে চলে আসা গৃহযুদ্ধের পরিণতি থেকে উদ্ধার পায় নি, যা মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রায় এক লক্ষের মত প্রাণ হরণ করেছিল. এই যুদ্ধ হয়েছিল সরকার, যেখানে সবচেয়ে প্রভাবশালী জায়গা দখলে রেখেছে সিংহলী প্রজাতির লোকরা, আর তামিল ইলম স্বাধীনতা আদায়ের টাইগার জঙ্গীদের মধ্যে. এই যুদ্ধ আসলে কোন ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না, কিন্তু বেশ কিছু চরমপন্থী বৌদ্ধ রাজনীতিবিদ সমাজে তামিলদের প্রতি বিদ্বেষ ভাব প্রচারের জন্য কম শক্তি প্রয়োগ করেন নি, এই কথা মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের নিগ্রো বলে ডাকা হয়ে থাকে, আর তারা কখনোই গৃহযুদ্ধে কোন পক্ষ নেয় নি. তাদের নিজেদের আলাদা করে একসাথে থাকার মতো কোন এলাকা নেই. তাই আলাদা হয়ে যাওয়ার মনোভাবও নেই. তার চেয়েও বেশী হল তামিল অধ্যুষিত উত্তরের জাফনা এলাকাতে যে সব নিগ্রো লোকরা রয়েছেন, তারা নিজেরাই এই গৃহযুদ্ধের সময়ে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন – ১৯৯০ সালে টাইগার জঙ্গীরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে সমস্ত নিগ্রো দের তাড়িয়ে দিয়েছিল”.

    আজ সারা বিশ্বের মনোযোগ এই গৃহযুদ্ধের সময়ের ঘটনার প্রতি নিবিষ্ট রয়েছে. শ্রীলঙ্কার সরকারের বিরুদ্ধে ও রাষ্ট্রপতি মহিন্দ রাজপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে দোষ দেওয়া হচ্ছে. প্রায়ই এই অভিযোগ শুধু ন্যায় বিচারের জন্যই করা হচ্ছে না, যত না করা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার উপরে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য. কিন্তু যে ভাবেই হোক, সরকারকে আত্মরক্ষার অবস্থান নিতে হচ্ছে.

    এই রকমে পরিস্থিতিতে খুবই সন্দেহজনক হয়েছে সেই ধারণা করা যে, এই নতুন করে মাথা চাড়া দেওয়া ধর্মীয় ও প্রজাতি গত বিরোধ শ্রীলঙ্কায় সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে.