সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে এ সপ্তাহে মস্কোতে, বেইজিংয়ে, ওয়াশিংটনে ও প্যারিসে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে. জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, সিরিয়ায় ৩০০ জন সদস্যের একটি সামরিক পর্যবেক্ষক দল অতি শীঘ্রই পাঠানো হবে. এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা জাতিসংঘের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে. গতকাল শনিবার সিরিয়ায়  জাতিসংঘের মিশন পাঠানোকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এ সংক্রান্ত চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়. বান কি মুন সিরিয়ার সরকার ও অন্যান্য পক্ষকে মিশনের পর্যবেক্ষকদের অবাধ চলাচল, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা প্রদানের জন্য আহবান জানান.

      সিরিয়ার বিরোধীদলের সাথে মস্কো আলোচনা করেছে. সিরিয়ায় সংকট শুরু হওয়ার পর এ ধরনের পাঁচবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হল. সর্বশেষ রাশিয়া এসেছেন সিরিয়ার গণতান্ত্রিক যুদ্ধ বিরতির জাতীয় কমিটির সমন্বয়কারী . ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিখ্যাত মানবাধিকার কর্মী হাইসাম মানা. রেডিও রাশিয়াকে তিনি জানান,  সিরিয়ায় সহিংসতা বন্ধে রুশ সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে. আমরা সিরিয়ার জাতীয় সমন্বকারী কমিটি ও রুশ সরকারের মাঝে যোগাযোগের একটি ক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছি. আমরা এবং মস্কো সিরিয়ায় বিদেশীদের সামরিক হস্তক্ষেপ হতে দেব না. উভয় পক্ষই মনে করছে সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক সংস্কার হওয়া প্রয়োজন’.

       বেইজিংয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভালিদ মুল্লায়েম. চীনা কর্তৃপক্ষ তাকে নিশ্চিত করেছে যে, সিরিয়ায় বিদেশীদের সামরিক হস্তক্ষেপ হতে দেওয়া যাবে না এবং একই সাথে সিরিয়ায় জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলে চীন তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে. বেইজিং জোর দিয়েই বলেছে যে, দামাস্কাস যেন কফি আনানের পরিকল্পনা মাফিক কাজ করা শুরু করে দেয়.

একই সাথে সিরিয়ায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য আরও একটি কারণ রয়েছে. এমনটি মনে করছেন প্রাচ্যতত্ত্ব গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস দলগোভ. তিনি বলেছেন,

     ‘সিরিয়ার অস্ত্রধারী দলগুলোর আগ্রাসন বন্ধ করাই মূল কাজ নয় বরং তাদেরকে বিদেশ থেকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করতে হবে. অস্ত্রধারীরা তুরষ্ক ও লেবানন থেকে সিরিয়ায় প্রবেশ করছে. যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা জোট ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের সমর্থন যোগাচ্ছে.  এটাই অস্থিতিশীল পরিবেশের অন্যতম প্রধান কারণ’.

        সিরিয়ায় অস্থায়ী যুদ্ধ বিরতিকে প্রতিটি বিদেশী রাষ্ট্রের উচিত সমর্থন জানানো. এ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ. সিরিয়ার সংকট নিরসনে রাশিয়ার উদাহরণ নিতে আহবান জানান, যাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত পূর্নতা পায়. ল্যাভরোভ বলেছেন,

      ‘একটি শ্রেনী রয়েছে যারা কফি আনানের পরিকল্পনাকে নষ্ট করতে চাচ্ছে. এ পরিকল্পনা গৃহিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই তারা এ কথা বলেছে. আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে, আজও তারা নানাভাবে পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছে. বিরোধীদলকে অস্ত্র সরবরাহ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দিয়ে তারা এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে’.  

       সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সমারিক অভিযান শুরু করতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন পানেতা. তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, আপাতত গণতান্ত্রিক উপায়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে.

অন্যদিকে তুরস্কের ভূখণ্ডে সিরিয়া কর্তৃক গুলি ছোড়ার ঘটনায় আঙ্কারা ন্যাটোর দৃষ্টি আকর্ষন করেছে. এ বিষয়ে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন.

       প্রসঙ্গত, এপ্রিল মাসের শুরু দিকে তুরস্কের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেওয়া সিরিয়ার শরনার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়. এ ঘটনাকে তুরস্ক দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে ধারণা করছে. এ ঘটনার কারণে তুরস্ক অবশ্য ন্যাটো জোটের সাহায্য নিতে পারে. এমনটি মনে করছেন  প্রাচ্যতত্ত্ব গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ সেরগেই দেমিদেনকো. তিনি বলেছেন,

       ‘এ ধরণের বিপদজনক পথে তুরস্ক অগ্রসর হবে আমার তা মনে হচ্ছে না. এটি হচ্ছে প্রথম কারণ. দ্বিতীয়ত, সিরিয়ার সংকট সামরিক উপায়ে সমাধানের জন্য পশ্চিমা জোট প্রস্তুত নয়. এই সূত্রে আবার ইসরাইলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হতে পারে. তাই, ন্যাটোর কাছে তুরস্কের পরামর্শ চাওয়া তা শুধু তথ্য যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে যা এখন সিরিয়ার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে’.

        প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘সিরিয়ার বন্ধু’ শীর্ষক ১৪ জাতির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দামাস্কাসের ওপর একচেটিয়া চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে ওই বৈঠকে ফ্রান্স দামাস্কাসের ওপর কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব করেছে. যদিও মস্কো ও বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গী বিবেচনা করে ওই প্রস্তাব অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে.

     উল্লেখ্য, তিউনেশিয়া ও ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হওয়া সিরিয়ার বন্ধু বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা প্যারিসের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না. এ ক্ষেত্রে দুটি বিতর্ক রয়েছে. প্রথমত- সিরিয়ার বন্ধু, এরা সত্যিই সিরিয়ার বন্ধু নয়. যদি তারা সিরিয়ার বৈধ প্রতিনিধিদের ছাড়াই বৈঠকে মিলিত হয়. সিরিয়ার সংকট সমাধানে যেখানে স্বয়ং জাতিসংঘের দূত কফি আনানের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, সেখানে কি কোন ভিন্ন কর্মসূচির কি প্রয়োজন আছে?. নানা সমস্যার পরও ইতিমধ্যে কফি আনানের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে. এরই অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সিরিয়ায় পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩০০ জনে উন্নীত করেছে.