দাবা আর রাজনীতি অনেক বিষয়েই এক রকমের. আর এটাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই – কারণ দাবার ঘুঁটি গুলিকেই ষষ্ঠ শতাব্দীর সেনা বাহিনীর আদলে ভেবে বার করা হয়েছিল. যুগ পাল্টে গিয়েছে, কিন্তু যোগাযোগ, যা এই প্রাচীন খেলাকে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এখনও জুড়ে রেখেছে, তা শুধু আরও মজবুত হয়েছে. একবিংশ শতকে আগের মতই মানুষ এই খেলার দিকে মন দিয়েছে, যাতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গুলিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়. আমরাও চেষ্টা করবো জীবনের উপরে তার আদর্শ মডেলের প্রিজমের মধ্য দিয়ে দেখার – যার নাম দাবা. নতুন এক প্রবন্ধ পরিক্রমার আয়োজন করা হচ্ছে এবারে “বড় খেলা: দাবা ও রাজনীতি” নামে. বাস্তব বিশ্বের ঘটনার উপরে মন্তব্য করবেন আন্তর্জাতিক দাবায় গ্র্যান্ড মাস্টার ও ২০০৭ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন ভ্লাদিস্লাভ ত্কাচেভ.

    রাষ্ট্রসঙ্ঘের পর্যবেক্ষকরা দামাস্কাসে পৌঁছেছেন, যাতে তারা লক্ষ্য করতে পারেন, কি করে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষ দূত কোফি আন্নানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে. সিরিয়ার পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তার বাইরে থেকেও করা হচ্ছে: মস্কো থেকে দামাস্কাসের সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেমন, তেমনই নিয়মিত ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষের নেতাদের সঙ্গে.

    আরব বসন্ত ২০১১ সালে সিরিয়ার চৌকাঠে ধাক্কা খেয়েছিল. তা সহজেই গড়িয়ে সারা গরম কাল, হেমন্ত, শীত পার হয়ে আবার বসন্তে পৌঁছেছে. বিরোধী পক্ষের সংগ্রাম – তা যেমন দেশের ভিতর থেকে, তেমনই দেশের বাইরে থেকেও – বাশার আসাদের প্রশাসনের সঙ্গে এই সারাটা বছর জুড়েই এক মুহূর্তের জন্যও থামে নি. সিরিয়াকে লিবিয়ার মতই ছোঁ মেরে নিয়ে নেওয়া তার বিরোধীদের পক্ষে সম্ভব হয় নি. দামাস্কাসের এই রকম অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার গোপন উত্স কি আর কেনই তার বিরুদ্ধে কিছু দেশ একেবারে এককাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই পরিস্থিতির প্রতি নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্য রেখেছেন আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ড মাস্টার ভ্লাদিস্লাভ ত্কাচেভ, তিনি বলেছেন:

    “সিরিয়ার ভৌগলিক অবস্থানই এমন যে, তা রয়েছে নিকটপ্রাচ্যের রাজনীতির প্রধান খেলোয়াড়দের চৌমাথায় – যা সহজেই দাবা খেলার শুরুতে বোর্ডের কেন্দ্র দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়. কারণ এই কেন্দ্রের চারটি ঘরের দখলই খেলার পরবর্তী অনেক চালের বিষয় নির্দিষ্ট করে দেয়, যে কে এই খেলায় পরে প্রধান হবে. একই ভাবে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক এক দিক থেকে, আর ইরান অন্য দিক থেকে লড়াই করছে এই ঐস্লামিক জগতের কেন্দ্রীয় যুদ্ধ ক্ষেত্রের উপরে প্রভাব বিস্তার করার মতে জায়গা দখলের জন্য. তাই যেমন যে কোন আধুনিক দাবা খেলার লড়াইতে, তেমনই এখানেও বাইরের থেকে সাহায্য না পেয়ে চলছে না. যুযুধান প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষদের হয়ে সহকারী পরামর্শদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপীয় সঙ্ঘ এই সব খেলোয়াড়দের এখন অকুণ্ঠ সহায়তা করে চলেছে, তার মধ্যে আইন সংক্রান্ত সাহায্যও রয়েছে – প্রতি দিনই রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই খেলার আইন ঘিরে বিতর্ক চলছে.

    দাবার স্ট্র্যাটেজির একটি প্রধান স্বীকার্য নিয়ম হল যে, যখন কেউ উদ্যোগ নিতে পেরেছে, তখন তাকে আক্রমণ করতেই হবে. আর এটা খুবই ভাল করে বুঝতে পেরেছে এর – রিয়াদ, দোহা ও আঙ্কারা শহরে – তারা ইতিমধ্যেই সম্মিলিত ভাবে প্রস্তাব তৈরী করেছে সিরিয়ার বিরোধী যোদ্ধাদের আর্থিক সাহায্য করার ও উড়ান বিহীণ অঞ্চল তৈরী করার. সিরিয়ার কর্তৃপক্ষ এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে অনেক চাল দিতে হবে: তা সে নির্বাচনের আইন সহজ করাই হোক, দেশের সরকারি ক্ষমতার বাটোয়ারাই হোক অথবা অন্য কিছু হোক”.