(এই প্রবন্ধটি সমীক্ষকের একান্ত ব্যক্তিগত মতামত, রেডিও রাশিয়ার সম্পাদকীয় বিভাগের কোন দায়িত্ব নেই).

    ১৯শে এপ্রিল বৃহস্পতিবার ভারত নিজেদের প্রথম আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক রকেট “অগ্নি- ৫” এর পরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে করেছে. এই রকেটের কাজ করার ক্ষমতা পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূর অবধি. এক টন অবধি ওজনের পারমানবিক অস্ত্র এই রকেট বয়ে নিয়ে যেতে পারে. ভারতীয় সরকারি প্রতিনিধিরা বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, এই পরীক্ষা কোন দেশের বিরুদ্ধেই করা হচ্ছে না, বরং রকেট তৈরী করা হচ্ছে শুধু পারমানবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসাবে.

    ভারত বাস্তবে সেই ধরনের পারমানবিক ক্ষমতা সম্পন্ন দেশ গুলির এলিট ক্লাবে প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য দরখাস্ত করেছে এই রকেট দিয়ে, যাদের কাছে রয়েছে আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক রকেট ব্যবস্থা. এতদিন পর্যন্ত এই ধরনের রকেট ছিল শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চিন, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে. এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, “অগ্নি – ৫” রকেট আলাদা কিছু পরীক্ষার পরে ২০১৪- ২০১৫ সালে ভারতীয় সেনা বাহিনীতে সংযোজিত হবে.

    ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে সামগ্রিক উল্লাসের প্রচুর খবর দেখতে পাওয়া গিয়েছে, একই সময়ে বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলি ও রাজনীতিবিদরা এই পরীক্ষা নিয়ে যথেষ্ট সংযত ভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ও এই প্রবন্ধের সমীক্ষক বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “এখানে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল যে, পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম গুলি এই বিষয়ে খুবই সংযত ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে. এটার কারণও রয়েছে: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোন রকমের বিবাদ হলে ৫ হাজার কিলোমিটার অবধি কাজ করে এমন রকেট বাস্তবে কোন লাভজনক ব্যাপার নয়. পাকিস্তানের বেশী করে ভয় পাওয়া দরকার “অগ্নি – ১” ও “অগ্নি – ২” রকেট, যেই গুলির কাজ করার ক্ষমতা ২০০০ কিলোমিটার অবধি. আর পাকিস্তানে প্রকাশিত বহু রচনাতেই খুবই স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে যে, “অগ্নি – ৫” চিনের প্রায় সমস্ত এলাকাতেই যে কোন লক্ষ্য ধ্বংস করতে সক্ষম”.

    আরও ইন্টারেস্টিং যে, চিনের ইংরাজী ভাষায় সংবাদপত্র চায়না ডেইলি এই পরীক্ষাকে মাত্র কয়েকটি লাইনে বর্ণনা করেছে, পাশে একটি সচিত্র বর্ণনা সমেত: সেখানে রকেটের ড্রয়িং ও পূর্ব গোলার্ধের মানচিত্র রয়েছে, যার উপরে লাল রঙের বিন্দু দিয়ে দেখানো রয়েছে সেই সমস্ত এলাকা, যেখানে “অগ্নি – ৫” গিয়ে পড়তে পারে. এটা রাশিয়ার প্রত্যন্ত উত্তর পূর্ব অঞ্চল বাদ দিয়ে প্রায় সমস্ত এশিয়া, পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ, পূর্ব আফ্রিকা, ভারতীয় মহাসাগরের সমস্ত অঞ্চল একেবারে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর পশ্চিম সমুদ্র তীর পর্যন্ত.

    এই প্রসঙ্গে প্রচুর প্রশ্নের উদ্ভব হয়. এই কথা সত্য যে ভারত বর্তমানে এলিট পারমানবিক ক্লাবে ঢুকেছে, কিন্তু তার ফলে এশিয়াতে ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় শক্তির ভারসাম্য কতখানি পরিবর্তিত হয়েছে? এটাও সত্য যে, “অগ্নি – ৩”, “অগ্নি -৪” রকেটের তুলনায়, যেগুলির কাজ করার ক্ষমতা ছিল তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার, “অগ্নি – ৫” চিনের সমস্ত এলাকাতেই আঘাত করতে সক্ষম. কিন্তু এর মানে কি তাই হল যে, ভারত চিনের সঙ্গে রকেট – পারমানবিক ক্ষেত্রে একটা সম মানে পৌঁছেছে? স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে তা নয়, এই কথা মনে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “চিনের ডিএফ – ৩১ ও ডিএফ – ৩১এ রকেট অনেক বেশী দূর অবধি আরও বেশী ওজনের বোমা নিয়ে যেতে পারে. কিন্তু এখন প্রশ্ন হয়েছে পারমানবিক অস্ত্র আজকের দিনে কি ধরনের অর্থ রাখে? এটা কি আর আটকে রাখার মত অস্ত্র রয়েছে, যে রকমের ছিল যখন এই অস্ত্র ছিল শুধু পাঁচটি পারমানবিক রাষ্ট্রের হাতেই?

    সম্ভবতঃ ১৯৯৮ সালে, যখন ভারত ও পাকিস্তানে পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছিল, তখন থেকেই একটা গুণগত দিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে. এর পর থেকেই পারমানবিক অস্ত্র আটকে রাখার বদলে ভয় দেখানোর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে. তা না হলে আর অন্য কিছু দিয়েই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে না সেই সব বাস্তব, যেমন ইজরায়েলের কাছে পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে, যাদের কাছে এমনিতেই প্রতিবেশী দেশ গুলির তুলনায় অনেক বেশী পরিমানে সাধারন সামরিক অস্ত্র প্রযুক্তি রয়েছে. অন্য কিছু দিয়েই উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, যখন তারা সারাক্ষণ এই নিয়ে একটা দরাদরি করে চলেছে, নিজেদের পারমানবিক পরিকল্পনা ক্ষেত্রে কাজ বন্ধ করার বদলে আর্থিক সাহায্য পেতে চাইছে. আর আমাদের কি অবাক হওয়া উচিত্, তাই নিয়ে যে, ইরান পশ্চিমের তরফ থেকে নিয়মিত চাপের মধ্যে থেকে একই ভাবে এখন নিজেদের পারমানবিক অস্ত্র সৃষ্টির কাছে চলে এসেছে”?

    আজ প্রধান প্রশ্ন এই রকমের হয়ে দাঁড়িয়েছে: আগে যেটা প্রতিহত করার উপযুক্ত পারমানবিক অস্ত্র ছিল, তা বর্তমানে ভয় দেখানোর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে ও সামরিক কাজকর্মের রঙ্গমঞ্চের অস্ত্রে পরিণত হতে চলেছে?

    এখানে মনে পড়ে যায় গ্যারি গ্যারিসনের “অন্তিম যুদ্ধ” গল্পের কথা, যেখানে বাবা বাচ্চাদের কাছে গল্প করেছেন যে, সমস্ত যুদ্ধ থেমে গিয়েছিল চির কালের জন্যই, কারণ, শেষমেষ এমন এক “অন্তিম অস্ত্র” খুঁজে পাওয়া গেল, যা শত্রুদের আর আক্রমণ করতে দেবে না. আর তাদের দেখালেন... তীর ও ধনুক.