এই তো কয়েক দিন আগে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় চীনা সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় আফ্রিকান ইউনিয়নের এক সম্মেলন কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয় . এই কেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় হয় ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার. চীনা সরকারের মতে, ওই সম্মেলন কেন্দ্র আফ্রিকা মহাদেশে অন্যতম বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে. এ ধরনের প্রকল্পের সংখ্যা আবার কমও নয়.  আফ্রিকার জন্য চীনের অবস্থান কেমন হবে- নতুন উপনিবেশ নাকি দাতাদেশ?.

বিগত ১০ বছরে আফ্রিকা মহাদেশে চীনের বিনিয়োগের মাত্রা ১৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেড়েছে ১০ গুন. বর্তমানে আফ্রিকা-চীনের মধ্যে অর্থ বিনিয়োগের পরিমান হল ১৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার. চীনের স্ট্রেটেজিক সম্পদের মধ্যে বিশেষত কয়লা যা কিনা চীনে অপ্রতুল থাকলেও এ সম্পদে আফ্রিকা যথেষ্ট সমৃদ্ধ. এ কারণেই বেইজিং আগামীতে এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে. আফ্রিকায় চীনের অবস্থানকে চীন প্রান্তীয় পাথর হিসেবে দেখছ যা কিনা পররাষ্ট্র রাজনীতির পথে নির্দেশনা দিচ্ছে. এ বিষয়ে বেশ কয়েকবারই বলেছেন স্বয়ং চীনা প্রশাসন যারা এখন আফ্রিকার নিয়মিত অতিথি. চীনা বিশেষজ্ঞরা আফ্রিকায় শুধুমাত্র স্থাপনা নির্মাণ কাজেই সাহায্য করছেন না বরং তারা গ্রাম্য অর্থনীতি, শিল্প উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে সাহায্য করছে. চীন আফ্রিকায় সামাজিক নানা অবকাঠামো যেমন- স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণে সাহায্য করছে. আফ্রিকায় বর্তমানে কয়েক হাজার চীনা চিকিত্সক, শিক্ষক এ প্রকৌশলী কর্মরত আছেন.

চীন বর্তমানে পুরো আফ্রিকা মহাদেশেই নিজেদের উপস্থিতি বিরাজ করতে সক্ষম হয়েছে. অন্যদিকে চীনের প্রধান প্রতিদন্ধী যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র আফ্রিকার তেল সমৃদ্ধ  অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে. এমনটি বলছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় বিষয়ক একাডেমীর পরিচালক আন্দ্রেই ভালোদিন. তিনি বলছেন,

‘চীন অনেক আগে থেকেই আফ্রিকায় বিনিয়োগ করে আসেছে. চীন মনে করছে যে, আফ্রিকা প্রায় বিনিয়োগহীন একটি মহাদেশ যেখানে  অনেক নতুন দরকারী প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে. স্বভাবতই তা আফ্রিকার জনগনকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্ব বহন করবে না বরং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পর্ণ তৈরি করতে সহায়তা করবে. আফ্রিকায় চীনের প্রভাবের কারণে দেশটি পশ্চিমা মিত্রজোটের রোষানলে পরবে’.

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, আফ্রিকার সাথে চীনের জ্বালানী ক্ষেত্রে সম্পর্কের সূচনা ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরই. কোন প্রকার বাঁধা ছাড়াই এটিই স্বভাবতই আফ্রিকায় অনেক বড় প্রকল্প শুরু করতে বেইজিংকে সহায়তা করেছে. ২০০০ সালের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন ধরনা করেছিল যে, তারা হয়ত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বিশ্বের এই  অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব হারাতে চলছে এবং এ করণেই চীনকে সরানোর নানা চেষ্টা শুরু করে. সবার শুরুতে এই প্রতিযোগিতা প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যই শুরু হয়েছে. সুদান ও দক্ষিণ সুদান যা কিনা পূর্ণ যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে তাকেই বিশেষজ্ঞরা বেইজিং ও ওয়াশিংটনের দ্বিমতের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন. দক্ষিণ সুদান যা তেল সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত গতবছরই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সহায়তার জন্যই স্বাধীনতা অর্জন করে. তবে ওই তেলের সরবরাহ কাজ শুধুমাত্র সুদানের ভূখণ্ড ব্যবহার করেই কেবল সম্ভব. তাই তেল উত্তোলনের চেয়ে এখন তা সরবরাহ করাই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে.

বেশ কয়েকটি সূত্র থেকে পাওয়া সংবাদে জানা যায়, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এ দুটি দেশই দক্ষিণ সুদানে অস্ত্র সরবরাহ করছে. দক্ষিণ সুদানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরণের প্রভাবকে বিশেষজ্ঞরা দেশটির তেল উত্তোলন ক্ষেত্র থেকে চীনা কোম্পানীগুলোকে হঠানোর পায়তার বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা. এ ধরণের পরিস্থিতি উগান্ডার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে যেখানে সম্প্রতি বড় তেল ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে.

 

চীনা ব্যবসায়ীরা দৃড়তার সাথে বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকায়  অত্যন্ত চতুর মনোভাব বিরাজ করে কাজ করছে. সেখানের তেল সমৃদ্ধ এলাকাগুলো অস্ত্রধারীদের কাছে থেকে মুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোন ভূমিকা রাখছে না. ওয়াশিংটন বলছে যে, বেইজিং সুলভে প্রাকৃতিক সম্পদ পাওয়ার জন্যই আফ্রিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে এবং আফ্রিকা চীনের উপনিবেশ বলে উল্লেখ করেছে. সামগ্রিক অর্থে আফ্রিকাকে নিয়ে আরও বিতর্ক এখনও রয়ে গেছে.