১লা জুলাই ইউরোপীয় সঙ্ঘ ইরানের খনিজ তেল ক্রয়ের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করছে. কিন্তু ইরান ঠিক করেছে আগে ভাগেই সক্রিয় হতে. ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেনের পরে আসন্ন কয়েক দিনের মধ্যেই ইউরোপীয় সঙ্ঘের আরও কয়েকটি দেশে তারা খনিজ তেল রপ্তানী বন্ধ করে দিচ্ছে. এই ব্যবস্থা দিয়ে তেহরান ইউরোপীয় সঙ্ঘের তরফ থেকে নিষেধাজ্ঞা নেওয়ার আগেই বড় রকমের খনিজ তেলের সঞ্চয় তৈরী করার পথ কঠিন করতে চাইছে. বিশেষজ্ঞরা ইরানের বিরুদ্ধে খনিজ তেলের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা নেওয়া ব্যাপারটাকে আত্মহত্যার সামিল বলছেন: নিজেদের জ্বালানী শক্তি সংক্রান্ত ভারসাম্যের ফাঁক ভর্তি করার জন্য ইউরোপের কিছুই থাকবে না.

বেশ কয়েক মাস আগেই, ইউরোপীয় সঙ্ঘের পক্ষ থেকে ইরানের খনিজ তেল ক্রয়ের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা নেওয়া হতে চলেছে বলে খবর জানার পরেই, তেহরানে ঠিক করা হয়েছিল দেরী না করে নিজেদের তরফ থেকেই বাধার সৃষ্টি করে দুটি ইউরোপীয় দেশে খনিজ তেল পাঠানো বন্ধ করার. এই তালিকা ক্রমবর্ধমান. ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্রের খনিজ তেল মন্ত্রী রোস্তাম হাসেমি ঘোষণা করেছেন যে, তাঁদের দেশ একেবারেই ইউরোপের তরফ থেকে খনিজ তেল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা নেওয়াতে উদ্বিগ্ন নয়. রপ্তানী কারক দেশ গুলির সংগঠনে ওপেক দেশ গুলির মধ্যে খনিজ তেল রপ্তানীর বিষয়ে ইরান শুধু সৌদি আরবের চেয়েই কম রপ্তানী করে থাকে.

ইরানের রপ্তানী করা তেলের অংশের প্রায় বিশ শতাংশ ইউরোপীয় সঙ্ঘের মোট আমদানী: এটা তিন কোটি টন. এই তেলের গ্রাহকদের মধ্যে বৃহত্তম এখনও চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও জাপান. আর তারা ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত তেহরানের বিরুদ্ধে খনিজ তেল আমদানীর বিষয়ে কোন রকমের নিষেধাজ্ঞা নিতেই চায় না. রাশিয়ার কোম্পানী “ট্রান্সনেফ্ত” এর প্রধান নিকোলাই তোকারেভ মনে করেন যে, ইরানের খনিজ তেল সম্বন্ধে ইউরোপীয় সঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞা – এটা “হারাকিরি”. ইউরোপের বাজারে এত বিশাল পরিমানে খনিজ তেল অন্য দিক থেকে পাঠানো ও নিজেদের উত্পাদন হঠাত্ করে বাড়ানো স্রেফ সম্ভব নয়. জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তা তহবিলের জেনারেল ডিরেক্টর কনস্তানতিন সিমোনভ এই প্রসঙ্গে মত প্রকাশ করে বলেছেন:

“ইউরোপীয় সঙ্ঘ এক কষ্টকর ইতিহাসে জড়িয়ে পড়ছে. সম্পূর্ণ ভাবে ইরানের খনিজ তেল আমদানীর বদল করা খুবই কঠিন হবে. তার ওপরে সেটা ইউরোপে মোটেও সমান ভাবে ভাগ করা নয়, বরং কিছু জানা দেশের উপরে বিশেষ করে বেশীটা ভাগ করা রয়েছে, যেখানে তাদের মোট আমদানীর এটা প্রায় তিরিশ শতাংশ. এরা হল গ্রীস, ইতালি, স্পেন – ইউরোপের দক্ষিণ দিক, যারা এমনিতেই সঙ্কটের কারণে বেশী করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে. আর তারই এখন আবার বাড়তি আঘাতের সম্মুখীণ হয়েছে. ইউরোপ কিসের উপরে ভরসা করে আছে? সৌদি আরবের উপরে, যারা হঠাত্ করে তেলের উত্পাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করে দেবে?  কিন্তু ইরানের তার ওপরে সুযোগ রয়েছে খরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার, আর তখন সৌদি আরব থেকে সারা বিশ্বেই আর খনিজ তেল আসতে পারবে না, ঠিক তেমন করেই কাতার থেকে তরল গ্যাসও না”.

ইরান ইউরোপে রপ্তানী করা থেকে নিজেদের ক্ষতি বরং চিন ও অন্যান্য দেশের জন্য পূরণ করে ফেলতে পারে, এই কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ সের্গেই পিকিন বলেছেন:

“চিন – খনিজ তেল ও গ্যাসের এক বিশাল গ্রাহক দেশ. চিনের তরফ থেকে ইচ্ছা করা হলে, তারা সেই পরিমান নিজেরাই নিয়ে যেতে পারে, যা ইউরোপীয় সঙ্ঘকে দেওয়া হবে না. অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আন্তর্জাতিক সমাজ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সঙ্ঘের তরফ থেকে চিনের উপরে চাপ অবশ্যই সৃষ্টি করা হবে. কিন্তু তারা, সাধারণত, নিজেদের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির উপরেই খেলতে ভালবাসে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই ইউরোপ রাজনীতিবিদদের তৈরী রূপকথায় বন্দী হতে চলেছে. কারণ ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনার সামরিক লক্ষ্য নিয়ে কোন ভরসা যোগ্য সাক্ষ্য এখনও পাওয়া যায় নি. আর নিষেধাজ্ঞা, যে গুলি ইরানের অর্থনীতির উপরেই আঘাত করতে বাধ্য ছিল ও তাদের পক্ষ থেকে পারমানবিক অস্ত্র তৈরী করা বন্ধ করাতে বাধ্য করত, তা বাস্তবে নেতিবাচক ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সঙ্ঘের নাগরিকদের উপরে প্রভাব ফেলেছে.

প্যারিসে, লন্ডনে ও ওয়াশিংটনে আরও বেশী করে কথা হচ্ছে স্ট্র্যাটেজিক খনিজ তেলের ভাণ্ডার খুলে দেওয়ার, যাতে পেট্রোলের দাম বাড়া থামানো যায়. আমেরিকার লোকরা খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছে খনিজ তেলের দাম এত বেশী করে নিয়মিত বাড়ছে বলে. আর বর্তমানের হোয়াইট হাউসের দলের জন্য আগামী নির্বাচনের সময়ে এটা সিদ্ধান্ত মূলক বিষয় যদি নাও গয়, তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে. ইরানের খনিজ তেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ইউরোপের রাজনীতিবিদরাও ঝুঁকি নিচ্ছেন: পেট্রোল সেখানেও দামে বাড়ছে. কিন্তু “অসুবিধা জনক” ইরানের উপরে চাপের “জোয়াল”, সম্ভবতঃ, সাধারন যুক্তির পাল্লার উল্টো দিকেই বেশী ভার বাড়িয়েছে.