ব্রিকস দেশ গুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা সংক্রান্ত নীতির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এই কথা ঘোষণা করেছেন ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি দিলমা রুস্সেফ্ফ, তাঁর সহকর্মী মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার সঙ্গে বৈঠকের পরে. তাঁর কথামতো, নতুন ছাপা নোটের প্লাবন ও সস্তায় ডলার ধার দেওয়ার নীতি, উন্নতিশীল দেশ গুলির অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বিপজ্জনক হয়েছে. এই ধরনের সমস্যার সমাধান করতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে নেওয়া ব্যবস্থা সাহায্য করতে পারে, - উন্নয়ন ব্যাঙ্ক তৈরী করা ও জাতীয় মুদ্রায় একে অপরের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা, এই কথাই উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা.

    সুদের হার অত্যন্ত কম হওয়া ও পরিমান দিয়ে নরম করার নীতি – দেশের অর্থনীতিতে প্রচুর পরিমানে বাড়তি নোট ছেড়ে দেওয়া – যার ফলে আমেরিকার মুদ্রার দাম কমে যাচ্ছে. আমেরিকার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নেওয়া এই পদ্ধতির ফলে আমেরিকার রপ্তানী বাড়ছে. কিন্তু তা অন্যান্য দেশের রপ্তানীর জন্য হয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর সমান, বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন দিলমা রুস্সেফ্ফ, তার কারণ যে এর ফলে অন্যান্য দেশের রপ্তানীর ক্ষমতা প্রতিযোগিতার উপযুক্ত আর থাকছে না. এই ধরনের বিপদের ভয় পাওয়া – কোন রকমের ফাঁকা আওয়াজ নয়. বিগত দেড় বছরে বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী ব্রাজিলের মুদ্রা রিয়াল শতকরা তিরিশ শতাংশের বেশী দামী হয়ে গিয়েছে. ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রী গিদো মন্তেগা এই ঘটমান বর্তমানের নাম এক অর্থেই উল্লেখ করেছেন – আন্তর্জাতিক মুদ্রার যুদ্ধ. তাঁর কথামতো, একই ধরনের পদ্ধতি দিয়ে ইউরোপের প্রশাসন কাজ করছে – ইউরো মুদ্রার দাম কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে সঙ্কটের পরিনাম থেকে অর্থনীতিকে অতিক্রম করতে সাহায্য করা সম্ভব হয়. ব্রিকস দেশ গুলির নেতারা একাধিকবার ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই ধরনের রাজনীতি করা বন্ধ করতে বলেছেন, তার ওপরে এটা আন্তর্জাতিক নিয়মেরও উল্টো ব্যাপার, এই কথা রেডিও রাশিয়াকে ব্যাখ্যা করে হায়ার স্কুল অফ ইকনমিক্সের প্রফেসর ম্যাক্সিম ব্রাতেরস্কি বলেছেন:

    “এটা কোন নতুন ঘটনা নয়, একই জিনিস হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, যখন বেশ কিছু দেশ নিজেদের মুদ্রার দাম ইচ্ছা করেই কমিয়েছিল, যাতে রপ্তানীর বিষয়ে প্রতিযোগিতায় সুবিধা হয়. প্রসঙ্গতঃ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি কাজই হল, এই ধরনের প্রচেষ্টার মোকাবিলা করা. কিন্তু যখন কথা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে, তখনই সেই সংস্থা কেন যে, বিশেষ কিছু সংগ্রাম করতে চায় না. ব্রিকস দেশ গুলি, এমনকি সিওল শহরে আর্থিক ভাবে বড় কুড়ি দেশের শীর্ষ সম্মেলনেও আমেরিকার লোকদের অনুরোধ করেছিল বিশ্ব অর্থনীতিতে এত বেশী পরিমানে ডলার না ছাড়তে. কিন্তু তারা এই ধরনের আহ্বানে কান দেয় নি. স্বাভাবিক ভাবেই নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যাই তাদের কাছে বেশী কাছের ব্যাপার”.

    রাশিয়া সবার আগে ঘোষণা করেছিল যে, কেউই আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না, নিজেদের ত্রাণের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে. এই ধারণা পরে অন্য দেশ গুলি সমর্থন করেছে, এই কথা উল্লেখ করে ম্যাক্সিম ব্রাতেরস্কি বলেছেন:

    “নয়া দিল্লী শহরে শেষ শীর্ষ সম্মেলনে এই ক্ষেত্রে একটি দিক পরিবর্তনের ঘটনা হয়েছে. এই দিকে শীর্ষ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া. এটা যেমন উন্নয়ন ব্যাঙ্ক তৈরী করা, তেমনই ব্রিকস দেশ গুলির মধ্যে পারস্পরিক ভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা. প্রসঙ্গতঃ, এর আগেই রাশিয়া ও চিন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে জাতীয় মুদ্রায় করার জন্য. রাশিয়ার এই ধরনের চুক্তি রয়েছে তুরস্কের সঙ্গেও”.

    উল্লেখ করবো যে, দক্ষিণ – দক্ষিণ নামের উন্নয়ন ব্যাঙ্ক তৈরী করার জন্য এক মূল উদ্যোক্তা দেশ হল ব্রাজিল. তা ব্রিকস দেশ গুলির সঞ্চয় কে একত্রিত করে এই দেশ গুলির মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে পাঠানোর জন্য তৈরী করা হবে. এই ভাবেই ব্রিকস দেশ গুলি শুধু নিজেদের উন্নত দেশ গুলির মুদ্রা সংক্রান্ত রাজনীতি থেকেই নিজেদের বিপদ মুক্ত করতে পারবে না, বরং এই ধরনের উন্নয়ন ব্যাঙ্ক তৈরী হলে বাকী উন্নতিশীল দেশ গুলিও আলাদা করে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, এই বিশ্বাস নিয়ে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ম্যাক্সিম গলোভিন বলেছেন:

    “এই ব্যাঙ্কের স্রষ্টা দেশ গুলি নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক পারস্পরিক কাজকর্ম আরও বৃদ্ধি করবে. তারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেও নিজেদের ভার বৃদ্ধি করতে পারবে, যেখানে অন্য কম উন্নত দেশ গুলিকে অর্থ যোগান দিয়ে তা করতে পারা যাবে. এই অর্থে, অবশ্যই, উন্নত দেশ গুলির তরফ থেকে নির্দিষ্ট বিপদের ভয় পাওয়া হতে পারে. কিন্তু বর্তমানে উন্নতিশীল দেশ গুলির প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে আলাদা করে হিসাব না করা সম্ভব নয়. অর্থাত্ এখানে কথা হচ্ছে শুধু এই নিয়েই, যে, নতুন করে শক্তির ভারসাম্য কি রকমের হবে”.

    নতুন উন্নয়ন ব্যাঙ্কের অর্থ নিয়ে ও নতুন কাঠামোকে সমর্থন করার কথা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রধান রবার্ট জোয়েলিক. এখানে যোগ করবো যে, এপ্রিল মাসের শেষেই ব্রিকস দেশ গুলির জন্য অন্য একটি প্রতীকী প্রশ্নের সমাধান হতে পারে – আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে তাদের কোটা বৃদ্ধি. অন্তত এর আগে এই বিষয় নিয়ে ঘোষণা করেছেন তহবিলের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্ড.