ভ্লাদিমির পুতিনের মন্ত্রীসভায় চার বছরের কাজের জন্য কোন লজ্জাই নেই. রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বুধবারে লোকসভায় বাত্সরিক রিপোর্ট নিয়ে ভাষণ দিয়েছেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন মন্ত্রীসভার কাজের ফলাফল নিয়ে, আর তারই সঙ্গে দেশের পরবর্তী কালের উন্নয়নের জন্য প্রধান সূচক গুলি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন.

ভ্লাদিমির পুতিন লোকসভার সদস্যদের কাছে প্রতি বারের মতই রিপোর্ট নিয়ে এসেছেন. যদিও আজ অনেক কিছুই ছিল অসাধারণ. লোকসভার সদস্যরা পাল্টে নতুন লোকরা এসেছেন, আর এটাও ঠিক যে প্রধানমন্ত্রী এখানে শুধু মন্ত্রীসভার প্রধান হিসাবেই নন, বরং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসাবেও ভাষণ দিয়েছেন. নিজের ভাষণের শুরুতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এখনও রাজনৈতিক যুদ্ধের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে. কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক গণতন্ত্রের যুক্তি হল যে, নির্বাচনের পরেই শুরু হয়ে যায় আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় – সম্মিলিত ভাবে কাজের সময়.

নিজের চার বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বের ফল নিয়ে বলতে গিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই সময় ছিল বিশ্বের ইতিহাসে অভূতপূর্ব আর্থ- বিনিয়োগ সঙ্কটের সময়ে. “এটা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল. কিন্তু আমরা ভেঙে পড়ি নি, আমরা নিজেদের জাতিকে প্রাপ্তবয়স্ক, সৃষ্টি শীল, আত্ম বিশ্বাসী হিসাবে দেখাতে পেরেছি, যাদের ভিতরে প্রবল জীবনীশক্তি রয়েছে”. তিনি উল্লেখ করেছেন:

“এটা ঠিকই যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই এই সঙ্কট আমাদের জন্যেও ছিল পরীক্ষা ও কঠোর পরীক্ষার মতই. আমরা আমাদের কিছু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে সময় ও গতি হারিয়ে ফেলেছিলাম, কিন্তু আমরা উন্নয়নের দিক হারিয়ে ফেলি নি, সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য. এই কথাও সত্য যে, আমাদের অর্থনীতির পতন হয়েছিল অনেকটাই. কিন্তু আমরা আবার করে ফিরে আসতে পেরেছি অনেক দ্রুতই, অন্যান্য অনেক দেশের চেয়েই. আজ আমরা “জি – ৮” দেশ গুলির মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতির উন্নতির হার অর্জন করেছি, আর বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি গুলির মধ্যে একটি দ্রুত উন্নতিশীল দেশ হতে পেরেছি. আমি এখানে তুলনা করার জন্য মনে করিয়ে দেবো: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির উন্নতির হার ছিল ১.৭ শতাংশ, ইউরোপীয় এলাকায় ১.৫ শতাংশ, ভারতে ৭. ৪ শতাংশ, চিনে ৯.২ শতাংশ আর রাশিয়াতে ৪.৩ শতাংশ. এটা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি গুলির মধ্যে তৃতীয় সূচক”.

ইতিবাচক গতি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সমস্ত প্রধান সূচক গুলিতেই. রাশিয়া- “বৃহত্ আটটি” অর্থনীতির মধ্যে একমাত্র দেশ, যারা ২০১১ সালের ফলাফলে ঘাটতি বিহীণ বাজেট ও এমনকি সামান্য বাজেট উদ্বৃত্ত ফল দেখাতে সক্ষম হয়েছে. রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণ বর্তমানে শতকরা দশ ভাগেরও কম. তুলনার জন্য বলা যেতে পারে ইউরোপীয় এলাকায় ঋণ প্রায় শতকরা নব্বই ভাগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও ইতালির বর্তমানে দেশের মোট জাতীয় উত্পাদনের চেয়ে শতকরা একশ ভাগ বেশী. রাশিয়ার বর্তমানে চিন ও জাপানের পরে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্ স্বর্ণ ও মুদ্রা সঞ্চয় রয়েছে. বিগত চার বছরে দেশে মূল্য বৃদ্ধির হার শতকরা তের ভাগ থেকে কমে ছয় ভাগ হয়েছে. রাশিয়াতে এত কম মাত্রায় মূল্য বৃদ্ধি আধুনিক রাশিয়ার ইতিহাসে কখনও হয় নি. প্রধানমন্ত্রী মূল সাফল্যের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার হারকে স্থিতিশীল করে দেশে লোকসংখ্যা বৃদ্ধিকে উল্লেখ করেছেন: গত বছরের ফলাফলে তা বেড়ে হয়েছে ১৪ কোটি ৩০ লক্ষ লোক. আমরা সঙ্কটকে আমাদের ইতিবাচক জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষণ নষ্ট করতে দিই নি, এই কথা উল্লেখ করে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন:

“গত চার বছরের ফলাফল মূল্যায়ণ করে আমরা সমস্ত রকমের ভিত্তির উপরে নির্ভর করেই বলতে পারি: রাশিয়া শুধু সঙ্কট অতিক্রমই করে নি, আমরা খুবই গুরুতর, বিরাট ও লক্ষ্যণীয় পদক্ষেপ সামনের দিকে নিতে পেরেছি, আমরা আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছি”.

দেশের ভবিষ্যত উন্নতি সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তা নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর নেওয়া সমস্ত উদ্যোগের বিষয়ে এক “দিক নির্দেশ” ঠিক করে দেবেন. এই প্রসঙ্গে তিনি পাঁচটি প্রাথমিক বিষয়কে মুখ্য বলে উল্লেখ করেছেন: জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সুদূর প্রাচ্য ও পূর্ব সাইবেরিয়ার এলাকায় উন্নয়ন, গুণগত ভাবে উন্নত কর্ম ক্ষেত্র সৃষ্টি, নতুন অর্থনীতি তৈরী ও বিশ্বে রাশিয়ার অবস্থানকে মজবুত করা. এই দিকে তিনি মনে করেন যে, ইউরো এশিয়া সমাকলনের পথেই এগিয়ে যাওয়া দরকার. বাস্তবে, এটা সমাকলনের প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে সরে আসার অযোগ্য করে তুলবে, এই বিশ্বাস নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন:

  “আমি বিশেষ করে উল্লেখ করতে চাই যে, শুল্ক সঙ্ঘ তৈরী ও ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক এলাকা তৈরী করার কথা. আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ রাজনৈতিক ও সমাকলনের প্রক্রিয়া সোভিয়েত উত্তর এলাকায় হতে চলেছে. সেই রাষ্ট্রের পতনের পরে. আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ – ২০১৫ সালে ইউরো এশিয়া অর্থনৈতিক সঙ্ঘের প্রকল্প শুরু করা. আশা করবো যে, রাশিয়া, কাজাখস্থান ও বেলোরাশিয়ার সঙ্গে অন্যান্য সহকর্মীরাও যুক্ত হবেন, যাঁরা আরও বেশী উন্নত সহযোগিতার আশা করেন”.

আরও একটি ভবিষ্যতের কাজ – দেশে বিনিয়োগের পরিবেশকে ভাল করা. রাশিয়া শুধু প্রতিযোগিতায় সক্ষম দেশ হলেই চলবে না, বরং তাকে হতে হবে ব্যবসার জন্য খুবই লোভনীয় দেশ. আমরা নিজেদের সামনে আগামী বছর গুলির জন্যে এই দিকে একশ পদক্ষেপ নেবো ও বর্তমানের ১২০ তম অবস্থান থেকে ২০ তম হবো, এই কথাই উল্লেখ করেছেন ভ্লাদিমির পুতিন. মন্ত্রীসভার প্রধান একই সঙ্গে কিছু লোকসভা সদস্যের রাশিয়ার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান সম্বন্ধে উদ্বেগ দূর করতে চেয়ে বলেছেন:

“আমি বিশ্বাস করি যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে এক প্রবল গতি নিয়ে আসবে আমাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতির জন্য. তার খোলামেলা ভাব, প্রতিযোগিতার বৃদ্ধি – রাশিয়ার নাগরিকদের জন্যই ভাল, আর আমাদের উত্পাদকদের জন্য – উন্নতি করার প্রয়োজনীয় উদ্দীপক. এর মানে হল নতুন সব বাজার ও নতুন সম্ভাবনা, যা আমরা এখনও দেখতে বা ভাল করে মূল্যায়ণ করতে অভ্যস্ত হই নি. শেষে বলা যেতে পারে যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হওয়ার কারণে, আমাদের সামনে খুলে যাচ্ছে সভ্য ভাবে, আইন সঙ্গত উপায়ে আমাদের স্বার্থ রক্ষা করার”.

ভ্লাদিমির পুতিন উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর সামনে রাশিয়ার উন্নতির জন্য নতুন পরিকল্পনা রয়েছে– দেশে রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা তৈরী করার সম্ভাবনা রয়েছে. আর রয়েছে সামাজিক জীবন যাত্রার ব্যবস্থা করা, যা দেশের নাগরিকদের জীবনের মানের উন্নতি করার কাজে দেশকে কয়েক দশক এগিয়ে নিয়ে যাবে. ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এই লোকসভায় রিপোর্ট দেওয়া শেষ বারের মতে হয়েছে. তিনি মে মাসে সেখানে আসবেন অন্য নতুন দায়িত্ব নিয়ে – রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি হিসাবে, যেখানে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাব করবেন.