“টাইম” জার্নাল নিজেদের পাঠকদের মধ্যে এক ইন্টারনেট মত গ্রহণের ব্যবস্থা করেছে, যেখানে চেষ্টা করা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তি নির্ণয় করার. যদিও এই সব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা জার্নালের সম্পাদক বর্গ ঠিক করবেন ও প্রকাশ করা হবে ১৭ই এপ্রিল, তাও প্রাথমিক ভাবে ভোট দেওয়ার ফলাফল খুবই অবাক করার মতো হয়েছে. আর এই রকমের একটি প্রধান আচমকা ব্যাপার পক্ষ ও বিপক্ষের ভোটে আধুনিক ভারতের এক সবচেয়ে ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচন.

    এই ইন্টারনেট – মত গ্রহণের সামগ্রিক ফলকে মনে করা যেতে পারে এক ধরনের বিরুদ্ধ বাদী প্রতিক্রিয়া. সব কিছুতেই বিরোধ দেখা যাচ্ছে. সেটা যেমন ইন্টারনেটে আর্বিভূত লোকদের নেতৃত্বে আসার ব্যাপারে: প্রথম স্থানে হ্যাকার দল “অ্যানোনিমাস”, দ্বিতীয় স্থানে – রেড্ডিট ইন্টারনেট সাইটের জেনারেল ডিরেক্টর, যিনি ইন্টারনেটে তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে ও “পাইরেসী বিরোধী” আইনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সক্রিয় এরিক মার্টিন.

    আর বিশ্বের নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র গুলির নেতারা খুবই দুর্বল ফল করেছেন: ভ্লাদিমির পুতিন একাদশতম স্থানে, বারাক ওবামা – একবিংশতম, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রেঝেপ তৈপ এর্দোগান – সাতাশতম ইত্যাদি. অ্যাঞ্জেলা মেরকেল, ডেভিড ক্যামেরন, বেনিয়ামিন নাথানিয়াখু, নিকোল্যা সারকোজি এমনকি প্রথম পঞ্চাশের মধ্যে জায়গাই পান নি. আর এটাও লক্ষ্যণীয় হয়েছে যে, বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতায় থাকা নেতাদের চেয়ে বেশী ভাল ফল করেছেন.

    ভারতের ক্ষেত্রে খুবই স্পষ্ট ভাবে এই লক্ষণ দেখা গিয়েছে, এই কথা বলেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি:

“ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন গুজরাট ও বিহার রাজ্যের মুখ্য মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও নিতীশ কুমার, আর তাদের সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা অণ্ণা হাজারে. প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সোনিয়া গান্ধী, আর এই সামান্য কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রী পদে এক নম্বর প্রার্থী হতে পারে এমন রাহুল গান্ধীকেও এই তালিকায় দেখতে পাওয়া যায় নি, যাঁদের জনপ্রিয়তা জার্নালের মতে এখন তালিকার শতকের চেয়ে অনেক পিছিয়ে”.

ভারত ও তার বাইরে তালিকার তৃতীয় স্থানে থাকা নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে অনেক ভোট পড়া খুবই সমালোচনার শিকার হয়েছিল. অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ফলাফলে সুযোগ করে দিয়েছে টাইম জার্নাল, যারা মার্চ মাসের একটি সংখ্যা একেবারে প্রথম পাতায় নরেন্দ্র মোদীর ছবি ছেপে তার সম্বন্ধে এক বিরাট প্রবন্ধ প্রকাশ করে তৈরী করে দিয়েছিল. মোদীর জন্য ভোট নেওয়ার শেষ দিনের আগেও অনেক পক্ষে ভোট ছিল, কিন্তু তার বিরোধীরা নিজেদের শক্তি সক্রিয় করতে সমর্থ হয়েছিল ও ফলে তার বিরুদ্ধে ভোটের সংখ্যা পক্ষের ভোটকে ছাপিয়ে গিয়েছিল. ভোট গ্রহণে এই ব্যক্তির চরিত্রের সমস্ত পারস্পরিক বিরুদ্ধ বিষয় প্রকট হয়েছে, এই কথা মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ২০১১- ২০১২ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনগুলিতে খুবই বাজ ফল করার পরে, নরেন্দ্র মোদী, সেই লোক, যাকে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে একজন সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদ প্রার্থী বলে মনে করা হয়েছে, ভারতীয় জনতা পার্টির এক প্রভাবশালী নেতা বলে. এই সম্ভাবনা এক দল লোকের কাছে উত্সাহের কারণ হয়েছে, অন্যেরা তাতে ভয় পেয়েছেন.

নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে তার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শাসন কালে ভারতের এক অন্যতম পিছিয়ে পড়া রাজ্য গুজরাট অর্থনৈতিক ভাবে সবল হতে পেরেছে বলে. কিন্তু তার বিরুদ্ধে যুক্তিও কিছু কম নেই. ২০০২ সালে মুসলমান জনগনের উপরে বীভত্স হত্যা ও ধ্বংস লীলা করানোর পিছনে তার নামও জড়িত হয়ে রয়েছে. তখ এক চরমপন্থী মুসলমান দল তীর্থ থেকে ফেরা এক ট্রেন হিন্দু যাত্রী সহ ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, তারপরে সারা রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছিল হানাহানি. ফলে নিহত ঘোষণা করা হয়েছে হাজার জনেরও বেশী আর এখনও ২০০ জনকে নিখোঁজ বলে মনে করা হয়েছে. মোদী এই সব রায়টে নিজের যোগদানের কথা অস্বীকার করেন, কিন্তু তার উগ্র পন্থী হিন্দুত্ব ও ভাষণের কথা সকলেই জানে. আর এটাই ভয়ের কারণ হয়েছে, যে এমনিতেই ভারতের বহু কষ্টে ধরে রাখা ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র ও শান্তি ভঙ্গ হতে পারে, যদি মোদী কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় আসে”.

মোদীর সরকারে আসার সম্ভাবনা সেই সমস্ত সমঝোতাকেও প্রশ্নের সামনে উপস্থিত করবে, যা এই রবিবারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির মধ্যে করা হয়েছে. পাকিস্তান বিরোধী কথাবার্তা মোদীর প্রকাশ্য ভাষণে খুবই বেশী, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের বিরোধের উত্পত্তি করতে পারে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার একাধিকবার মোদীকে তাদের দেশে যাওয়ার ভিসা দেন নি, এই ধরনের রাগ চট করে ভুলে যাওয়া হয় না.

সুতরাং “টাইম” জার্নালে নরেন্দ্র মোদীর প্রভাব শালীদের তালিকায় জায়গা হওয়া মোটেও কোনও আংশিক ব্যাপার নয়. আর তা শুধু একজন রাজনীতিবিদেরই ভাগ্য নির্ধারক হবে না, তার একটা সর্ব ভারতীয়, আঞ্চলিক এমনকি বিশ্ব মানের সমস্যাকেও ছুঁয়ে যায়.