রবিবারে পাক রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি দিল্লী যাচ্ছেন. যদিও এই সফর প্রথম থেকেই পরিকল্পিত ছিল ব্যক্তিগত হিসাবে, তবুও শেষমেষ দুই পক্ষই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে দেখা করবেন. আর সীমান্তের দুই পারে ও সারা বিশ্বে এটাকে মনে করা হয়েছে ভারত- পাক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তাপ বৃদ্ধি বলেই. কিন্তু এই ধরনের উষ্ণতা সকলের ভাল লাগে নি.

    ভারত- পাক সম্পর্ক – এটা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি সবচেয়ে দীর্ঘসূত্রী বিষয়, যা এশিয়াতে মজবুত শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাধা দিয়ে চলেছে. যদিও এই দুই দেশের মধ্যে বড় সশস্ত্র যুদ্ধ ঘটেছিল ১৯৯৯ সালে, তাও তখন থেকেই উত্তেজনার প্রশমন হয় নি. আর ভারতের ও পাকিস্তানের উভয় পক্ষের হাতেই পারমানবিক অস্ত্র তাকায় পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে.

    ২০০৫ সালে যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ ভারতে গিয়েছিলেন, তখন মনে হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে বোধহয় বিরোধ থেকে বেরিয়ে গঠন মূলক আলোচনা শুরু হতে চলেছে, আর তা সব রকমের সমস্যা নিয়েই, যার মধ্যে কাশ্মীর সমস্যাও রয়েছে. কিন্তু ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা এই সমস্ত পরিশ্রমের উপরে জল ঢেলে দিয়েছিল. আর শুধু কয়েক মাস আগে থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একটা দিক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে. রাষ্ট্রপতি জারদারির ভারত সফর এই আলোচনাতেই কিছুটা নতুন গতি এনে দিতে পারে, এই কথাই উল্লেখ করে স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “দিল্লী বা ইসলামাবাদে এই সফর থেকে অনেক বেশী কিছু কেউই আশা করে নি, সারা বিশ্বেও নয়. কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই বাস্তব ঘটনা যে, দুই দেশের নেতারা বেসরকারি ভাবে সাক্ষাত্কার করতে চলেছেন. আর বিশেষ করে আশার সঞ্চার করেছে সেই বিষয় যে, দুই পক্ষই এই সাক্ষাত্কারে সবচেয়ে বেশী বিরোধের বিষয় গুলি বাদ দিয়ে আলোচনা করতে রাজী হয়েছে – সেই ধরনের যেমন, কাশ্মীর সমস্যা ইত্যাদি, তার চেয়ে বরং সেই সমস্ত বিষয়ে বেশী করে মনোযোগ দিতে যা থেকে সত্যিকারের পারস্পরিক বোঝাপড়া হতে পারে: বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ও যুদ্ধ পরবর্তী আফগানিস্তানে সহযোগিতা নিয়ে”.

    কিন্তু মনে হয়েছে যে, ভারত- পাকিস্তানের এই কাছাকাছি আসা সবার জন্য লাভজনক নয়. কয়েক দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠিক করেছে নতুন করে আবার একটি তীক্ষ্ণতম প্রশ্ন উত্থাপন করার, যা দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা ও জটিলতা এনেছে. তারা লস্কর- এ – তৈবা নামক সন্ত্রাসবাদী দলের বর্তমানের স্রষ্টা ও আপাতত আইন সঙ্গত ভাবে কাজ করা অথচ মার্কিন প্রশাসনের চোখে সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্নিত জামাত- উদ- দাওয়া দলের প্রধান হাফিজ মহম্মদ সৈদকে ধরা বা তার সম্বন্ধে খবর দেওয়ার জন্য ১ কোটি ডলার অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করেছে, এই সৈদকে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার নিয়ন্ত্রক বলে মনে করা হয়েছে.

    এখন প্রশ্ন হল, কোন লোক দোষী কিনা তা বিচার করার ভার আদালতের, কিন্তু আজকের দিনে এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কোন প্রমাণ বা সরকারি অভিযোগ নথিভুক্ত করতে পারে নি, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “সাধারণত এত বড় মাপের অর্থ পুরস্কার সেই সমস্ত ক্ষেত্রেই ঘোষণা করা হয়ে থাকে, যখন সন্দেহভাজন ব্যক্তি আইনের কবল থেকে পালাতে চেষ্টা করে বা গা ঢাকা দিয়ে থাকে. সৈদ কিন্তু বহাল তবিয়তে পাকিস্তানে রয়েছেন. পাকিস্তানের সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বিপরীত শর্ত আরোপ করেছে: সৈদ কে গ্রেপ্তারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার দোষ প্রমাণিত হতে পারে, এমন নির্দিষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করা হোক, তার বদলে নানা রকমের কানাঘুষো ও চিন্তা প্রসূত সিদ্ধান্ত পেশ না করতে, যা এখন করা হচ্ছে.

    কিন্তু এটাই এখানে মুখ্য নয়, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই সময়, যেটা বাছা হয়েছে এই সৈদকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণার সময় বলে. এখন ভারতীয় ও পাকিস্তানী নেতাদের উপায় থাকবে না এই অসুস্থ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা না করে, যা অন্যান্য প্রশ্নে সহমতে আসার বিষয়ে নিশ্চয় করেই জটিলতা বৃদ্ধি করবে”.

    যেমন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি, তেমনই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এখন হাল খারাপ. দুজনেই দ্রুত জন সমর্থন হারাচ্ছেন, আর ক্ষমতাসীন দল দুই দেশেই পরবর্তী নির্বাচনের পরে পদচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনার সামনে পড়েছে.

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজে পাকিস্তানের বিরোধী পক্ষ এখন রাষ্ট্রপতি জারদারি ও প্রশাসনের উপরে হামলে পড়েছে. কয়েকজন তো রাষ্ট্রপতিকে তার ভারত সফর বাতিলই করতে আহ্বান করেছে.

আর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধি মার্ক টোনার বৃহস্পতিবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিক সম্মেলনে যতই নিজেদের উপর থেকে এই নতুন জটিলতা উপস্থিত হওয়ার জন্য দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করুন না কেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. দক্ষিণ এশিয়াতে দুই ভূ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর নৈকট্য ওয়াশিংটনের একেবারেই লাভজনক নয়, কারণ তা হলে এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই আর কোন কাজে লাগবে না.