ভারতে প্রথম দর্শণে খুবই অস্বাভাবিক এক স্ক্যান্ডাল হয়েছে. বুধবারে ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা বড় প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, ১৬ থেকে ১৭ই জানুয়ারী রাতে হরিয়ানা রাজ্যে ঘাঁটি গেড়ে বসা সাঁজোয়া গাড়ীর ব্যাটালিয়ন ও আগ্রায় থাকা ৫০ নম্বর প্যারাট্রুপার ব্রিগেড দিল্লীর দিকে রওয়ানা হয়েছিল. খবরের কাগজের তথ্য অনুযায়ী এই সেনা বাহিনীর চলাফেরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহমতে করা হয় নি, আর প্রশাসন “খুবই ভয়” পেয়েছিল. এমনকি নাকি বিপদ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছিল, আর এই সব সেনা দলকে অবিলম্বে নিজেদের স্থায়ী জায়গায় ফিরে যেতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল.

সংবাদপত্র বিশেষ করে চেষ্টা করেছে বিবরণে “অভ্যুত্থান” কথাটি বাদ দিয়ে যেতে, শুধু এই টুকুই উল্লেখ করেছে যে, সরকারি প্রশাসনের প্রতিনিধি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে নাকি যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল. কিন্তু মন্তব্য, যা এই প্রবন্ধ প্রকাশের পরেই চার দিক থেকে বর্ষিত হয়েছে, তাতে খুবই সক্রিয়ভাবে সামরিক অভ্যুত্থানের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এমনকি দেশের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ. কে. অ্যান্টনি আর তাদেরই সঙ্গে সুর মিলিয়ে সামরিক নেতৃত্বের প্রধান বিজয় কুমার সিংহ যে এই খবরকে “ভিত্তিহীন” বলে উপমা দিয়েছেন, তা স্বত্ত্বেও. জেনারেল সিংহ বলেছেন, “এটা সম্পূর্ণ বোকার মতো কথা, যেসব লোকে এই ধরনের কথা রটাচ্ছে, তাদের ইচ্ছা কোন কারণ ছাড়াই প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিবাদ বাঁধানোর, আর তাদের আদালতে তোলা উচিত্”.

ভারতীয় সংবাদপত্রের খবরের মধ্যে আরও অস্বাভাবিক হল য, ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে গত ৬৫ বছর ধরেই ভারতে, তাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের চেয়ে একেবারেই বিপরীত ভাবে সামরিক বাহিনীকে সব সময়েই বিশেষ করে রাজনীতির বাইরে রাখা হয়েছিল, আর ভারত ন্যায্য কারণেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসাবে গর্ব করে এসেছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আজকের দিনে সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য কোন রকমের অশনি সঙ্কেত নেই. এই কথা সত্য যে, বিগত কয়েক মাস ধরে জেনারেল বি. কে. সিংহ তাঁর অসামরিক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদ বাধিয়ে ছিলেন – তাঁর বয়স অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর প্রধানের পদে থাকার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল, আর চেষ্টা করা হচ্ছিল যে, তিনি আসলে এক বছর কম বয়সী, তা অবশ্য শেষ হয়েছে একেবারেই স্ক্যান্ডাল হয়ে.

বর্তমানের ভারতীয় সরকারকে নিয়ে অনেক অসন্তোষ দানা বেঁধেছে. কিন্তু কোন একটিও রাজনৈতিক শক্তি সামরিক অভ্যুত্থানের সমর্থন করবে না – এটা যেমন “সরকারের বিরোধী পক্ষ” ভারতীয় জনতা পার্টির  জোটের সম্বন্ধে বলা চলে, তেমনই “তৃতীয় ফ্রন্ট”, যা আঞ্চলিক ভাবে ক্ষমতাসীন দল গুলি ও আরও বেশী প্রসারিত সামাজিক গোষ্ঠী গুলি তৈরী করেছে, তাদের সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে. আবার সামরিক বাহিনীও জঙ্গী মাওবাদীদের সঙ্গে জোট তৈরী করতে যাবে না. সুতরাং অভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলা, কম করে বললে, বলা যেতে পারে, বাড়িয়ে বলা কথা”.

কিন্তু যেমন বলা হয়ে থাকে আগুন ছাড়া ধোঁয়া হয় না, তেমনি এখানে ব্যাপারটা সামরিক বাহিনীর দপ্তর প্রধান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবাদের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না. এখানে কথা হতে পারে আরও বড় মাপে প্রসারিত সমস্যার জটিলতা নিয়ে, এই কথাই উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারত আজ খুবই জটিল সময় পার হয়ে যাচ্ছে. গত বছরের সারা দেশ জোড়া দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন ও তার পরে খুবই বাজে ফল, যা “ক্ষমতাসীন দলের” পক্ষ থেকে ২০১১- ২০১২ সালের নির্বাচনে দেখানো হয়েছে, তা বলে দেয় যে, কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান খুবই নড়বড়ে, আর তা খুব বেশী হলে আগামী লোকসভা নির্বাচন, যা ২০১৪ সালে হওয়ার কথা ততদিন পর্যন্ত টিকবে. এমনকি সেই রকমের সম্ভাবনাও কম নেই যে, এই সব নির্বাচন সময়ের আগেও হয়ে যেতে পারে.

তাছাড়া – জেনারেল সিংহের নামকে নিয়ে স্ক্যান্ডালের সময়ে আরও প্রকট ভাবে ধরা পড়েছে যে আজকের ভারতের সামনে সেই ডিলেমা উপস্থিত হয়েছে: কি করে আঞ্চলিক নেতৃত্ব পাওয়ার দাবী করা যাবে, যখন দেশের অর্থনীতির উন্নতির গতি শ্লথ হচ্ছে, দেশের জাতীয় মুদ্রার দাম পড়ছে ও তখন তাদের সামর্থ্যের মধ্যে বেঁচে থাকতে বলা হচ্ছে. ভারত – বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানীকারক দেশ, যা তাদের ভূ রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রমাণ. আবার একই সঙ্গে জেনারেল বি. কে. সিংহের কয়েকদিন আগে লেখা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে লেখা পত্রে বলা হয়েছে সেই সব শোচনীয় পরিস্থিতির কথা, যেখানে ভারতীয় সামরিক বাহিনী আজ রয়েছে”.

এই সব পরিস্থিতি, যা জেনারেল সিংহের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বিবাদে, অথবা ১৬ থেকে ১৭ই জানুয়ারী রাতের সেনা বাহিনীর চলাফেরা নিয়ে হয়েছে  - এটা কোনও আলাদা করে আচমকা হওয়া ঘটনা নয়, বরং তা একটা ব্যবস্থার সঙ্কটেরই প্রমাণ, যাতে ভারত ও তার সামরিক বাহিনী বর্তমানে রয়েছে, এটাই মনে করেন এই রুশ পণ্ডিত(!).