বিগত সপ্তাহের শেষে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আগামী ৮ই এপ্রিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি ভারতে এক দিনের জন্য সফর করতে যাবেন. প্রাথমিক ভাবে এই সফরের উদ্দেশ্য হিসাবে জানানো হয়েছিল যে, তিনি ব্যক্তিগত কারণে ভারতে যাচ্ছেন ও আজমীর শহরে বিখ্যাত সুফী সন্ত মৈনুদ্দীন চিস্তির কবর পরিদর্শনে যাচ্ছেন. কিন্তু সোমবারেই খবরে প্রকাশ হয়েছে যে, তিনি তাঁর সফরের মধ্যে দিল্লী যাবেন, যেখানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন. পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির এই ভারত সফরের অর্থ কি দক্ষিণ এশিয়ায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ভূ রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালোর দিকে মোড় ফেরা বলে মনে করা যেতে পারে?

    পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির ভারত সফর ২০০৫ সালের পরে এই প্রথম. তখন মনে হয়েছিল যে, ভারত ও পাকিস্তানের নেতারা গঠন মূলক আলোচনা শুরু করতে পেরেছেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহু জটিল সমস্যা নিয়ে, যার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত কাশ্মীর প্রসঙ্গও রয়েছে. কিন্তু তার পরেই ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার পরে আলোচনা বাস্তবে স্থগিত হয়েছিল.

    বিগত মাস গুলিতে দুই পক্ষই বুঝতে পরেছে যে, বিবাদ কারুর জন্যই ভালো নয়, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “গত বছরের নভেম্বর মাসে পাকিস্তান ভারতের দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়ে. আর আগামী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির সাক্ষাত্কার শীর্ষ পর্যায়ে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় যোগাযোগ হতে চলেছে: সিওলে গত সপ্তাহে মনমোহন সিংহ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানির সঙ্গে পারমানবিক শীর্ষ সম্মেলনের নেপথ্যে আলাদা করে দেখা করেছেন. এই সাক্ষাত্কারের সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভারতীয় সহকর্মীকে পাকিস্তানে সফরের জন্য আমন্ত্রণ করেছেন”.

    কিন্তু এই আমন্ত্রণ, অথবা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির ভারত সফরের বাস্তবতা প্রধান প্রশ্নের উত্তর দিতে অসমর্থ হয়েছে: এটা কি – স্রেফ সৌজন্য সফর নাকি অর্থবহ আলোচনার শুরু? বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “যতটাই প্যারাডক্স মনে হোক না কেন, বাস্তব বিষয় হল, আফগানিস্তানের জটিল ও একেবারেই আগে থেকে অনুমান করা যায় না এমন পরিস্থিতি, ভারত ও পাকিস্তানকে গঠন মূলক আলোচনা শুরু করতে বাধ্য করেছে. ২০১৪ সালে এই দেশ থেকে ন্যাটো জোট ও মার্কিন সেনা বাহিনীর অপসরণের পরে এই দেশ ও তার চার পাশ ঘিরে পরিস্থিতি হতে পারে শুধু দুই রকমেরই. প্রথম হল – আফগানিস্তানে সকলেই সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে ও বাইরের দেশের শক্তি গুলির মধ্যে বিবাদ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশী হতে পারে, তার মধ্যে পশ্চিমের দেশ, পাকিস্তান, ভারত, চিন ও অন্যান্য দেশও থাকবে. দ্বিতীয় হল – বাইরের দেশ গুলির মধ্যে একটা সহমত ও দেশে এমন এক সরকারের প্রশাসন, যাকে বিশ্ব সমাজ তীব্র ভাবে অস্বীকার করতে চাইবে না. বোঝাই যাচ্ছে যে, দ্বিতীয় উপায়টি বেশী উপযুক্ত. আর ভারত ও পাকিস্তান যে এই দিকেই যেতে চায় তার জন্য লক্ষণ অনেক গুলিই দেখতে পাওয়া গিয়েছে”.

    পাকিস্তান ভারতের জন্য নিজের এলাকা দিয়ে পথ খুলে দিয়েছে, যাতে আফগানিস্তানে ভারত থেকে গম পাঠানো যেতে পারে. আর কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের সবচেয়ে বড় ইস্পাত উত্পাদক কোম্পানী স্টিল অথরিটী অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি চন্দ্র শেখর ভার্মা ঘোষণা করেছেন যে, ভারতবর্ষ চায় আফগানিস্তানের হাজীহকে লৌহ নিষ্কাশণ ও ইস্পাত উত্পাদনের জন্য প্রকল্পে বড় মাপের বিনিয়োগ করতে. এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে ভারত আফগানিস্তানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চিনকে সরিয়ে বৃহত্তম রাষ্ট্রের জায়গা নেবে.

    দেখাই যাচ্ছে যে, পাকিস্তানের কাছ থেকে সহায়তা না পেলে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে যে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা সম্ভব হবে না. ভারত ও আফগানিস্তানের কোনও সম্মিলিত সীমান্ত নেই, আর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে. আলাদা করে পথ রয়েছে ইরান হয়ে, কিন্তু তা যেমন দামী, তেমনই দূরের, তার ওপরে আবার বড় রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে.

    পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির ভারত সফর সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে না, কিন্তু দুই দেশের পক্ষ থেকে গঠন মূলক আলোচনা শুরু করার জন্য ইতিবাচক সঙ্কেত হতে পারে. আর সম্প্রতি কালে দুই দেশের মধ্যে যে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বেশী করে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, তাই বলে দিয়েছে কাশ্মীরের মতো সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমস্যার কি করে সমাধান করা যেতে পারে. বিশ্বের অভিজ্ঞতা যা বলে, তা হল, আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা শর্ত হতে পারে না, বরং এর যুক্তি সঙ্গত ফলই হতে পারে.