ব্রিক্সের অন্তর্ভূক্ত দেশগুলি – ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা – বিশ্বের আর্থিক বাজারে তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী খেলতে চায়. নয়াদিল্লীতে তাদের শীর্ষবৈঠকের শেষে গৃহীত সম্মিলিত ঘোষণাপত্রে এই উক্তি করা হয়েছে.

   পাঁচ দেশের নেতৃবৃন্দ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংস্কারের মন্থর গতিতে  অসন্তুষ্ট. তারা চলতি বছরেই ঐ তহবিলে ব্রিক্সের সদস্য দেশগুলিকে আরও বেশি ভোটাধিকার দেওয়ার দাবী করেছেন. সঙ্কেত স্পষ্ট – ব্রিক্সের সদস্য দেশগুলি আর মেনে নিতে রাজি নয়, যে পাশ্চাত্য দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলির স্বপক্ষে অধিকতর কোটা দেওয়ার ব্যাপারে সর্বসম্মত শর্তকে উপেক্ষা করে চলেছে. ২ বছর আগেই এই সম্পর্কে ঐক্যমত অর্জিত হয়েছিল. এই সময়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সংঘ ঋণের গভীর গাড্ডায় পড়েছে, আর অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিক্সের দেশগুলির অংশভাগ ক্রমশঃ বৃহত্তর হারে বাড়ছে.

    ব্রিক্সের নেতৃবৃন্দ সমৃদ্ধিশালী দেশগুলির বিরূদ্ধে এই অভিযোগ করেছেন, যে তাদের নীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে এবং সারা বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের সৃষ্টি করেছে. একইসাথে মার্কিনী মুদ্রানীতি পাশ্চাত্যকে একচেটিয়া সুবিধা দেয় আর উন্নয়নশীল দেশগুলি, যাদের আপাত কমজোরী মুদ্রা, তাদের উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে. নয়াদিল্লীর শীর্ষবৈঠক বহুমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণের অভিমুখে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে. পাঁচটি দেশের বৃহত্তম ব্যাঙ্করা ডলারকে বাতিল করে নিজেদের বাণিজ্যিক লেনদেন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিজ নিজ জাতীয় মুদ্রা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে. এই প্রসঙ্গে শুনুন নর্ড ক্যাপিটাল কোম্পানীর বিশ্লেষণ বিভাগের অধ্যক্ষ ভ্লাদিমির রোঝাকোভস্কির মতামত.

   এটা বাড়তি একটা পর্যায় – নিজস্ব মুদ্রাকে প্রথমে ডলারে বিনিময় করা, আর তারপরে আবার ডলার ভাঙিয়ে শরিকের প্রাপ্য অর্থ শোধ করা. যদি পণ্যআবর্তন নির্দিষ্ট একটা উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে অবশ্যই নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করা অনেক বেশি লাভজনক.

   বিশেষজ্ঞের মতে, এই আর্থিক মঞ্চে পারস্পরিক সরাসরি লেনদেন ব্রিক্সের দেশগুলির ভূমিকা গোটা বিশ্বে অনেক জোরদার করবে.

  পরিপ্রেক্ষিতে মুদ্রাসংঘকে মজবুত করা দরকার, যাতে পাঁচ দেশের মধ্যে অবাধে এই সব মুদ্রা আবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়. আর, হয়তো বা আগামী বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলনে নতুন কিছু লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা যাবে.

      এটা পাঁচটি দেশকে দেবে নতুন সুযোগ অন্য একটা আর্থিক প্রকল্প বাস্তবায়নের, যে সম্পর্কে নয়াদিল্লীতে বোঝাপড়া হয়েছে. এটা হল – অভিন্ন বিকাশ ব্যাঙ্কের পত্তণ. একইসাথে ঐ ব্যাঙ্ক থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দরিদ্র দেশগুলিও ঋণ পেতে পারবে. এই প্রসঙ্গে অর্থনীতি বিশ্লেষক নাতালিয়া স্মিরনোভার মন্তব্য শুনুন.

 বিশ্বব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল চালু করা হয়েছিল সেই আমলে, যখন উন্নত দেশগুলির ছিল একচেটিয়া অধিকার. যে সব প্রকল্প তারা বাস্তবায়িত করার জন্য গ্রহণ করে, সেগুলি আমেরিকা ও ইউরোপের জন্য লাভজনক. আর অন্যান্য সব প্রকল্প, যেগুলি আমেরিকা ও ইউরোপের পক্ষে বিতর্কজনক, তাদের আর্থিক ইন্ধন দেওয়া হয় না. অতএব, সম্ভবতঃ এই কারণেই ব্রিক্সের দেশগুলি আলাদা হতে চাইছে, নিজস্ব বিকাশ ব্যাঙ্ক খোলার সঙ্কল্প করেছে, যাতে আমেরিকা ও ইউরোপের মতামত উপেক্ষা করেই নিজেদের প্রকল্পগুলিকে আর্থিক ইন্ধন যোগানো যায়. ইউরোপের অসাদৃশ্যে ব্রিক্সের দেশগুলির কাছে পয়সা আছে. ইউরোপ ও আমেরিকা বহুকাল ধরে ঋণের সহায়ে টিঁকে আছে.

     নয়াদিল্লীতে ব্রিক্সের শীর্ষ সম্মেলন সবমিলিয়ে বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞা প্রদর্শন করেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার সাধনের ব্যাপারে. এবং এইভাবেই তারা গোটা দুনিয়ার সামনে তাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিফলিত করলো.