পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সঙ্গতি সাধন, - বিশ্লেষকদের মতে এটাই সেওল শীর্ষ সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল. সাধারণভাবে, পারমাণবিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সম্মেলন থেকে বিপুল অগ্রগতিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আশা করাও হচ্ছিল না. প্রধান বিষয় হল, দেশগুলি পারমাণবিক অস্ত্র প্রসার নিরোধের সমস্যা একসাথে আলোচনা করতে শুরু করেছে.

   একসময়ে পারমাণবিক প্রকৌশল সারা পৃথিবীর জন্য বিপুল অগ্রগতি হয়ে উঠেছিল, যখন বিদ্যুত্শক্তির চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছিল. যেমন সাধারণত ঘটে থাকে, আগে পরমাণু-বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ব্যবহার করতে শুরু করে সমরসেবীরা. তবে, এমনকি, এতেও একটা সদর্থক দিক ছিল : প্রধান প্রধান দেশের পারমাণবিক প্রতিসাম্য ছিল একটি মুখ্য উপাদান, যা পৃথিবীকে নতুন বিশ্বযুদ্ধ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল.

   একই সময়ে মানবজাতি শান্তিপূর্ণ পরমাণু ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে ক্রমেই বেশি করে উপলব্ধি করছে. বিগত কয়েক দশকে তার বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত আছে : যেমন চের্নোবিল পারমাণবিক বিদ্যুতে কেন্দ্রে দুর্ঘটনা, মার্কিনী ও ফরাসী পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা, এবং গত বছরে জাপানের ফুকুসিমায় বিপর্যয়. আর পারমাণবিক প্রকৌশলের অ-নিয়ন্ত্রিত বিকাশ পরমাণুকে সত্যি-সত্যিই “বোতল থেকে বার করা জিনে” পরিণত করতে পারে. আংশিকভাবে এর দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে বিশ্ব জনসমাজের উদ্বেগ.

   এ সম্বন্ধেই কথা হয়েছিল সেওলে, যেখানে গত সপ্তাহে সমবেত হয়েছিলেন পৃথিবীর ৫৩টি দেশের রাষ্ট্রনেতা, সরকারের নেতা এবং বিশেষজ্ঞরা. অবশ্য এ কথা ঠিক যে, এ সম্মেলনে তেহেরান এবং পিয়ং ইয়ংয়ের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ করা হয় নি. মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গীতে, এটিই ছিল সেওল শীর্ষ সম্মেলনের একমাত্র ত্রুটি. এমন পরিবেশ গড়ে তোলা উচিত্, যাতে পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত আলোচনায় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষ অংশগ্রহণ করে, বলেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দমিত্রি মেদভেদেভ :

   যে রাষ্ট্রগুলি সম্বন্ধে এত বলা হচ্ছে, তারা যদি আলোচনায় আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ করত, তাহলে খারাপ-কিছু হত না. আশা করব যে, আগে হোক পরে হোক, তারা আলাপ-আলোচনার টেবিলে ফিরবে এবং আমরা এ সংলাপ ক্রমানুবর্তন করতে পারব.

   সেওল শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফলের খতিয়ান টেনে দমিত্রি মেদভেদেভ বলেন যে, মোটামুটিভাবে সম্মেলনের কাজে তিনি সন্তুষ্ট. রাষ্ট্রপতি মনে করিয়ে দেন যে, মস্কো উদ্যোগ প্রকাশ করে বিদ্যমান কনভেনশনগুলির আধুনিকীকরণের ভিত্তিমূলক মান প্রণয়নের – সেই সঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তার কনভেনশনের, পারমাণবিক দুর্ঘটনা সম্বন্ধে তত্পর অবগত করার কনভেনশনের – এবং তাছাড়া, মস্কো পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ প্রকাশ করছে. অবশ্যই সমস্ত প্রশ্ন সমাধিত হয় নি. বিশেষ করে, মেদভেদেভের কথায়, কিছু কিছু দেশ পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কনভেনশন অনুমোদনে তাড়াহুড়ো করছে না, যা রাষ্ট্রসঙ্ঘে গৃহীত হয়েছিল ২০০৫ সালে. তবে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এ দিকে কাজ চলছে.

   সেওল শীর্ষ সম্মেলন দেখিয়েছে : জাপানের “ফুকুসিমা-১” পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রে যা ঘটেছে তা সত্ত্বেও, আজ বেশির ভাগ দেশ এ সিদ্ধান্তে আসছে যে, শান্তিপূর্ণ পরমাণুর ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী. স্বভাবতই, পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক প্রকৌশল প্রসার নিরোধের প্রশ্ন ক্রমেই বেশি তীব্র হয়ে উঠছে. একই সঙ্গে, শীর্ষ সম্মেলনের শেষ ঘোষণাপত্রে জোর দিয়ে বলা হয়েছে : এ সব বিপদ দূর করার জন্য নির্দেশিত ব্যবস্থা যেন শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিকাশে প্রত্যেক রাষ্ট্রের অধিকার বাস্তবায়নে বাধা না হয়.