মার্কিনী জাতীয় গোয়েন্দাবিভাগের সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানা গেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পানীয় জলের অবস্থা সম্পর্কে. আগামী ১০ বছরে পানীয় জল নিয়ে মারদাঙ্গা শুরু হওয়ার বোধহয় তেমন সম্ভাবনা নেই. তবে পরিপ্রেক্ষিতে জলের ঘাটতির সমস্যা তীব্রতর হবে এবং জল নিয়ে বিচসার সম্ভাবনা বাড়তেই থাকবে. সবচেয়ে সমস্যাসঙ্কুল এলাকা হিসাবে নিকট প্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নাম করা হয়েছে.

   বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছেন, যে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে বচসার স্থান দখল করবে পানীয় জলের সমস্যা. পানীয় জলের চাহিদা যেমন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, তেমনই শিল্পক্ষেত্রে ক্রমাগতঃ বাড়ছে, আর পানীয় জলের মজুত বাড়ছে না, বরং ক্রমশই কমছে. বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও সঙ্কুল করে তুলছেঃ একদিকে যেমন বিভিন্ন দেশ সর্বধ্বংসী বণ্যায় প্লাবিত হচ্ছে, পাশাপাশি বহু দেশ তেমনই ক্ষতিকর খরার শিকার হচ্ছে. গ্লেসিয়ারের উচ্চহারে গলন, বিশেষতঃ, মধ্য এশিয়ায় – তিব্বতের পাদদেশে, হিমালয়ে, পামীরে খানিকটা জলের অভাব মেটাতে সাহায্য করেছে, কারণ প্রায় শুকিয়ে যাওয়া আরল সাগর আবার প্রভাবতী হয়েছে. তবে সেইসাথেই একগাদা নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে. পাকিস্তানে ২০১০ সালের ভয়াবহ বন্যা গ্লেসিয়ারের গলনের সাক্ষী.

    পানীয় জলের সমস্যা – শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, রাজনৈতিক সমস্যাও, - বলছেন রুশী স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভোলখনস্কি.

   আজ পর্য়ন্ত দুনিয়ায় সব দেশের জন্য পানীয় জলের ব্যবহারের বিষয়ে অভিন্ন কোনো সনদ নেই. ইউরোপীয় কাঠামোগত কনভেনসন নির্ধারিত বিভিন্ন দেশের মধ্যে জলপ্রবাহের বন্টন নিয়ে কোনো সঠিক আইন জারী করে না. সর্বোপরি এটা সুপারিশ মাত্র, এবং আন্তর্জাতিক বিতর্কের মীমাংসা করার ক্ষেত্রে এই আইন একেবারেই অক্ষম. সুতরাং ঐ ধরনের বিতর্ক শুধুমাত্র পৃথক কোনো দেশের আইন, বা দ্বি-পাক্ষিক বোঝাপড়া বা কোনো জলাশয়কে নিয়ে বহুপাক্ষিক আপোষের মাধ্যমেই সম্ভব. স্বাভাবিকভাবেই যদি কোনো নদী কয়েকটি দেশের মধ্যে দিয়ে বয়ে যায়, তাহলে যারা নিম্নাংশে অবস্থিত, তারা অন্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে. অসংখ্য এরকম উদাহরন আছে. বিশেষতঃ মার্কিনী রিপোর্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় এই সমস্যা সবচেয়ে প্রবল.

 বাস্তবিকপক্ষে জল নিয়ে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে – বিশেষতঃ জলের ব্যবহার নিয়ে বচসার কারণেও বহু আন্তর্জাতিক সংকট জিইয়ে আছে. বলে চলেছেন বরিস ভোলকনস্কি.

   নিকট প্রাচ্যের সমস্যাবলীর দিকেই তাকিয়ে দেখুন. ইস্রায়েল সিরিয়াকে হল্যান্ড হাইট ছেড়ে দিতে রাজি নয়, এবং প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা স্বীকার করতে চায় না, কারণ ঐ সব এলাকায় ইস্রায়েলের জন্য সব পানীয় জলের উত্স অবস্থিত.

   এই ধরনের বিতর্কের মধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিতর্ক বোধহয় সবচেয়ে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী. কারণ পাকিস্তানকে স্নাত করা প্রায় সব মুখ্য নদীর উত্সই কাশ্মীরে. এত দিন পর্য়ন্ত দুই দেশ কেবলমাত্র ১৯৬০ সালেই জলাশয়ের ভাগাভাগির ব্যাপারে বোঝাপড়া করতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু পরে ভারত চিনাব নদীতে সেচখাল বানানোর পরে আবার নতুন করে বিরোধ শুরু হয়.

  ভারত নিজেও ভুক্তভোগী. চীন তার সিনসিয়ান-উইগুর স্বশাসিত এলাকার জলসেচের জন্য ব্রক্ষপুত্র নদের গতিপথ বদলে দিতে চায়.

  যেহেতু এশিয়ার অধিকাংশ মহানদীরই উত্স তিব্বতের পাদদেশে, তাই চীন তার ভৌগলিক প্রভাব প্রতিবেশীদের ওপর খাটানোর চেষ্টা করে. যেমন কাজাখস্তানের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি হিসাব করে দেখেছেন, যে চীন যদি ইরতীস নদীর উচ্চাংশে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে, তাহলে ঐ নদী তার গোটা প্রবাহিত পথে, এমনকি রাশিয়ার ওমস্ক শহর পর্যন্ত গোটা এলাকাকে বদ্ধ ডোবায় ও জলাজমিতে পরিণত করবে.

   এই সবকিছুই একটা কথাই বলে. রুশী বিশেষজ্ঞের মতে, আগামী কয়েক দশকে জল নিয়ে গুরুতর বিবাদ এড়ানোর জন্য, এখনি দরকার পানীয় জলের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কনভেনসনের সুপারিশ সব দেশের জন্য বাধ্যবাধক করে তোলা.