আপনারা শুনছেন রেডিও রাশিয়া থেকে ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ শীর্ষক অনুষ্ঠান. এই অনুষ্ঠানে আমরা শুধু আপনাদের করা প্রশ্ন গুলির উত্তর দিয়ে থাকি.

  সেই জন্যেই আমরা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মরিশাসের শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ রাখছি যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন করবার. লিখুন সেই সম্পর্কে, যা আপনাদের সবচেয়ে বেশি ভাবতে বাধ্য করে. আপনারাও এই অনুষ্ঠাণের যুগ্ম-সংকলক হতে পারেন. সুতরাং যোগ দিন. আর আমরা চেষ্টা করবো, আপনাদের আগ্রহ জাগানো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে.

  আজকে আমরা শুরু করছি: দিল্লী থেকে দীপক কুমারের পাঠানো প্রশ্ন দিয়ে – রাশিয়ায় কোন রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক বৃহত্তম?

রাশিয়ায় কৃষকরা শীতকালে, যখন জমি বরফে ঢাকা থাকে, তখন কি করে? – এই প্রশ্ন করেছেন বিহার রাজ্যের বার্মা নামক গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণ কুমার সিং, ২০১১ সালে আয়োজিত শ্রোতাদের সম্মেলনে.

    এবার উত্তর দিই. রাশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কের নাম স্বেরব্যাঙ্ক. ঐ ব্যাঙ্কের পত্তণ করা হয় আজ থেকে ১৭০ বছর আগে. সোভিয়েত আমলেও ঐ ব্যাঙ্ক চালু ছিল. রাশিয়ার ব্যাঙ্ক বাজারে স্বেরব্যাঙ্ক শ্রেষ্ঠতম, এই ব্যাঙ্কের ২০ হাজারেরও বেশি শাখা.  সরকারি অনুদানের কার্যকলাপে স্বেরব্যাঙ্ক সক্রিয়ভাবে সাহায্য করে, তারা বিভিন্ন শিক্ষামুলক ও চিকিত্সা প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়ে থাকে. রুশী সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও স্বেরব্যাঙ্কের অবদান আছে.

   অতঃপর ভারতেও স্বেরব্যাঙ্ক কার্যকরী হয়েছে. ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানে ২০০৯ সালে নয়াদিল্লীতে স্বেরব্যাঙ্কের শাখা খোলা হয়েছে.

  ২০১১ সালের শরত্কালে মস্কোয় স্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও ভারতের সাথে সহযোগিতা কারী রুশী বাণিজ্য বিনিময় সংস্থার উদ্যোগে তৃতীয় বারের মতো ভারত-রাশিয়া: বাণিজ্যিক সংলাপ শীর্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়. ঐ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা, রাজনীতিবিদেরা ও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন যৌথ প্রকল্পে ইন্দো-রুশী সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিষদে আলোচনা করে. উক্ত সম্মেলনে ভারতে স্বেরব্যাঙ্কের কার্যকলাপকে সাধুবাদ জানানো হয় এবং তাকে ভারতে কার্যরত সেরা রুশী কোম্পানী বলে ঘোষণা করা হয়.

  আমাদের নিয়মিত শ্রোতাদের তত্ক্ষণাত প্রশ্ন জাগবে – আর রাশিয়ায় কোনো ভারতীয় ব্যাঙ্ক কাজ করে কি?

      হ্যাঁ, আই.সি.আই.সি.আই ব্যাঙ্ক এখানে কাজ করে. তাছাড়া স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও মস্কোয় নিজস্ব শাখা খুলেছে অনেক বছর আগে থেকে.

আমরা আদ্যোপান্ত রাশিয়া শীর্ষক বেতারানুষ্ঠান পরিচালনা করছি. গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নয়াদিল্লীতে আয়োজিত শ্রোতা সম্মেলনে অন্যতম তত্পর শ্রোতা বিহারের কৃষ্ণ বিহারী সিং (যার ডাকনাম কিষান) আমাদের রুশী কৃষকদের সম্পর্কে আরও বেশি খবর দেওয়ার আবেদন করে, বিশেষতঃ অবসর সময়ে তারা কোন কুটীর শিল্পে নিয়োজিত থাকে. তার প্রশ্নটা ছিল এই রকম – যখন মাঠঘাট বরফে ঢাকা থাকে, তখন তারা কি করে?

      আমাদের দেশে ১৮০টি জাতির বসবাস. এবং প্রত্যেক জাতির লোকেদের শুধুমাত্র ভাষার বৈচিত্র্য নয়, প্রথাগত কুটীরশিল্প কর্মেরও প্রভেদ আছে, বিশেষতঃ শীতকালে. তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – মাটির পুতুল গড়া, যে সম্পর্কেই আজ আমরা আপনাদের বলতে চাই.

বাংলার একটি গ্রামের মেলার কথা আমি কখনো ভুলবো না. আমার বিশেষ করে মনে আছে, হাতে গড়া মাটির বাঁশির কথা.

    এর মধ্যে বিস্ময়কর কি আছে?

ছেলেবেলায় আমারও ঠিক ওরকম হাতে গড়া মাটির ভেঁপু ছিল মস্কোর শহরতলীতে গড়া. আমাকে ঐ ভেঁপুটি উপহার দেওয়া হয়েছিল এবং আমি বহুদিন ধরে ওটা নিয়ে খেলতাম. ভারতের একটা গ্রাম্য মেলায় দেখা মাটির বাঁশি আমাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গেছিল.

   আর ভেঁপু বা বাঁশি ছাড়া রুশী কৃষকরা মাটি দিয়ে আর কি তৈরি করতে পারে?

   বহু রকমের খেলনা: ঘোড়া, ভাল্লুক, হাঁস, মোরগ, হরিণ. কুটীরশিল্প প্রদর্শনীতে ঘোড়সওয়ারের মূর্তি বা বাচ্চা কোলে করা দীর্ঘ মাপের ফ্রক পরিহিত মহিলাদের মূর্তিও দেখা যায়. আমার বাড়িতে হাতে গড়া মাটির পুতুল আছে, যেখানে একশো বছর আগেকার গ্রাম্য পোষাক পরে কৃষক দম্পতি টেবিলে বসে আছে, তাদের সামনে ফুটন্ত সামোভার এবং এই সবকিছু আগুনে পোড়ানো ও হরেক রকমের রঙের.

  কোথায় আপনার ঐ মাটির স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে?

         আমি জানতাম, যে আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, আর তাই রুশী কৃষকদের ঐতিহ্যগত কুটীরশিল্প সম্পর্কে সবিষদে জানার জন্য আমি ভিয়াত্কার কাছে দীমকোভা গ্রামে গিয়ে পৌঁছাই. ওখানে ঐ কুটীরশিল্প ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরন্তর গড়া হয়ে চলেছে. ঐ উত্সবের আবির্ভাব হয় বহুকাল আগে এক বসন্তকালে, বাঁশির উত্সবে, যখন প্রাচীন রুশদেশে বাঁশির উত্সব উদযাপন করা হতো. ঐ মূর্তিপুজোর ঐতিহ্য ক্রমশঃ মানুষ ভুলে গেছে, কিন্তু শিশুদের জন্যে খেলনা এখনো বানানো হয়.

   ওখানে কি পাইকারী হারে খেলনা গড়া হয়?

        দীমকভে গড়া প্রত্যেকটি খেলনা বিশিষ্ট. মাটির তালের আকারদান থেকে তাকে রঙচঙ করার সৃজনশীল প্রক্রিয়া অভূতপূর্ব. আপনি কখনো দুটি একই রকমের পুতুল খুঁজে পাবেন না. প্রত্যেকটি পুতুলই একক ও অদ্বিতীয়.

   আর দীমকোভার কুমোররা কোন মাটির তাল ব্যবহার করে?

    ওটা হল স্থানীয় লালমাটি, যাকে নদীর চরের বালির সাথে ভালো করে মেশানো হয়. মাটির পুতুল গুলিকে ২ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত শুকিয়ে তারপর ৭০০-৮০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়. আগে পোড়ানোর পরে পুতুলগুলিকে খড়ি দিয়ে ঘষা হতো. আজকাল ২-৩ স্তরে সাদা রঙের আবরণ দেওয়া হয়, তারপরে রঙ করা হয়. ব্যবহৃত সব রঙই অত্যন্ত উজ্বল.

   রাশিয়ায় আর কোথায় মাটির পুতুল বানানো হয়?

      এরকম জায়গা অনেক আছে. কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় পুতুল বানানোর শৈলী ও রঙের প্রভেদ আছে. আজকাল কৃষকরা আর নিজেরা পুতুল বিক্রয় করার জন্য বাজারে যান না, তাদের প্রতিনিধিরা দোকানে গিয়ে পুতুল বিক্রয় করার প্রস্তাব দেয়.

আমার রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তরে সফরকালে স্থানীয় কুমোরদের শৈলী প্রত্যক্ষ করার ইচ্ছা হয়. আমাদের দেশে নববর্ষ উপলক্ষে অথবা জন্মদিনে রঙীণ পুতুল উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে. অনেকেই ঐরকম পুতুল সংগ্রহ করে, এবং বহু রুশী বাড়িতে এরকম মাটির পুতুলের সম্ভার লক্ষ্য করা যায়.

   আমরা রাশিয়ার কুটীরশিল্প সম্পর্কে ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ শীর্ষক আগামী অনুষ্ঠাণগুলিতে আলোচনা করবো. আপনাদের মঙ্গল কামনা করি.