উত্তর কোরিয়া নিজেরা অংশগ্রহণ না করেও ২৬-২৭শে মার্চ সিওল শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পারমানবিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত শীর্ষবৈঠকে একটা ষড়যন্ত্র চোখের সামনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে. তারা হুমকি দিয়েছে যে, এই সম্মেলনে তাদের দেশের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হলে তাকে তারা মনে করবে যে, উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে. এই প্রসঙ্গে বিশ্বের পঞ্চাশটিরও বেশী দেশের ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতৃত্বের অংশগ্রহণে হতে যাওয়া সম্মেলনে পিয়ং ইয়ং এর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের বিষয়ে সাহায্য করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের এশিয়ার সহকর্মী দেশ গুলি – দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান.

নতুন আন্তর্জাতিক স্ক্যান্ডালের বাইরে থেকে মনে হওয়া কারণ – উত্তর কোরিয়ার কৃত্রিম উপগ্রহ. “জ্যোতির্ময় নক্ষত্র” নামের এই উপগ্রহ তারা ঠিক করেছে পাঠাবে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা কিম ইর সেনের ১০০ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে. তাই পিয়ং ইয়ং এর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ – খুবই গুরুতর. রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত তাদের রকেট প্রযুক্তি নির্মাণে নিষেধ করেছে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে সামরিক পূর্বাভাস কেন্দ্রের প্রধান আনাতোলি ত্সীগানক বলেছেন:

“কক্ষপথে এই উপগ্রহ পাঠানোর মানে হবে যে, উত্তর করিয়া লোকরা বর্তমানে ব্যালিস্টিক প্রযুক্তি আয়ত্ত্বের মধ্যে এনেছে. যদি কৃত্রিম উপগ্রহ থাকে, তাহলে স্পষ্টই বুঝতে হবে, যে খুব সম্ভবতঃ, তাতে কোন একটা পারমানবিক অস্ত্র থাকতেই পারে. কারণ উত্তর কোরিয়া এই বিষয়ে কোন রকমের আন্তর্জাতিক বাধা নিষেধের আওতায় পড়ে না. এই উপগ্রহ খুব স্বাভাবিক ভাবেই কোন বিশেষ এলাকার উপরে লক্ষ্য করে পাঠানো যেতে পারে, যা উত্তর কোরিয়ার তরফ থেকে হুমকির সমান হতে পারে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই বিষয়টিকে যেমন নিজেদের মধ্যে, তেমনই রাশিয়া ও চিনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সময়ে উত্থাপন করতে চাইছে. একই সময়ে ওয়াশিংটন, টোকিও আর সিওলের জন্য “জ্যোতির্ময় নক্ষত্রের” উড়ানের খবর, যা পিয়ং ইয়ং থেকে গত শুক্রবারে প্রচার করা হয়েছে, তা কোনও নতুন খবর নয়, এমনকি আচমকা ব্যাপারও নয়, এই কথা উল্লেখ করে সুদুর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ইভগেনি কিম বলেছেন:

“উত্তর কোরিয়ার লোকরা উপগ্রহ পাঠানোর বিষয়ে জানিয়েছিল অনেক আগেই, তার মধ্যে আমেরিকার লোকরাও রয়েছেন, যাদের বলা হয়েছিল গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই. তারা এটাই কিছু দিন আগে আবার করে বলেছে ওয়াশিংটনে বৈঠকের সময়ে, যখন কথা হয়েছিল পিয়ং ইয়ংকে খাদ্য দ্রব্য সরবরাহ করার বিষয়ে. আমেরিকার লোকরা তখন এটার বিরোধিতা করেছিল, বলেছিল, এটা ভাল কাজ হচ্ছে না. তা স্বত্ত্বেও তারা নিজেরাই সমঝোতার পথে এগিয়েছে – খাদ্য দ্রব্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, বদলে চেয়েছে সমস্ত রকমের পারমানবিক পরীক্ষা নিরীক্ষার উপরে নিষেধাজ্ঞা নেওয়া ও দূরে উড়ে যেতে পারে এমন রকেট পরীক্ষা বন্ধ করা”.

এখন মনে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের এশিয়ার সহযোগী দেশ গুলি “জ্যোতির্ময় নক্ষত্রের” উড়ান নিয়ে নিজেদের একটা নতুন খেলা খেলতে চাইছে. আর সেটা লক্ষ্য করা হয়েছে চিনের বিরুদ্ধে. এর আগে সিওলে এশিয়া সমস্যা সংক্রান্ত মার্কিন রাষ্ট্রপতির পরামর্শ দাতা ড্যানিয়েল রাসেল চিনকে উত্তর কোরিয়ার উপরে তাদের সমস্ত রকমের প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত হতে বলার উপদেশ দিয়েছেন. এই প্রশ্ন বারাক ওবামা ঠিক করেছেন সোমবারে চিনের সভাপতি হু জিন টাও এর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে তোলার.

একই সময়ে কিছু দিন আগে চিনের পার্টির সংবাদপত্র “ঝেনমিন ঝিবাও” এর হোল্ডিং এর এক ইংরাজী ভাষার “গ্লোবাল টাইমস” নামের খবরের কাগজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই ধরনের যুক্তিকে ভুল ও অগ্রহণযোগ্য বলে লেখা হয়েছে. সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেজিং পিয়ং ইয়ং এর উপরে কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, কারণ একই ভাবে ওয়াশিংটন, টোকিও ও সিওলকে প্রমাণ করে দিতে পারে না যে, উত্তর কোরিয়াকে সারাক্ষণ বন্দুকের চাঁদমারি বানিয়ে রাখার দরকার নেই. তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, জ্যোতির্ময় নক্ষত্রকে ঘিরে যে শোরগোল তোলা হয়েছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন এই কারণে যে, যাতে সারা বিশ্বকে দেখানো যায় – দেখুন চিনের উপগ্রহ গুলি কি রকমের আচমকা কাজ কর্ম করছে. এই সবের পিছনে চেষ্টা চলছে চিন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে একটা গোলমাল বাধিয়ে দিতে, তাদের একে অপরের থেকে আলাদা করে দিতে.

এই ধরনের খেলা মনে তো হয় না যে, পারমানবিক নিরাপত্তা নিয়ে শীর্ষবৈঠকের ক্ষেত্রে কোন সুবিধা করে দেবে. কারণ তার ধারণা – আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বৃদ্ধি করা ও পারস্পরিক ভরসা মজবুত করা. পর্দার আড়ালে যে সমস্ত রাজনৈতিক খেলা চালানো হচ্ছে তা মোটেও ছয় পক্ষের আলোচনাকে নতুন করে শুরু করার পক্ষে কোন সুবিধা করে দেবে না, যেখানে আবার কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলকে পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত করার জন্য অংশ নেওয়ার কথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, দুই কোরিয়া, রাশিয়া ও জাপানের. তার ওপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও  উত্তর কোরিয়া, চিন ও রাশিয়ার মতোই, বিগত সময়ে এই বিষয়ে অগ্রগতি করতে পেরেছে যে, এই ধরনের আলোচনা আবার পুনর্বহাল করা যেতে পারে.

এরই মধ্যে আসন্ন শীর্ষবৈঠকের পূর্বে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি হতে পারে এই খবরে যে, সিওল ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিজেদের দূর পাল্লার ব্যালিস্টিক রকেট তৈরী করা নিয়ে এক সমঝোতায় পৌঁছেছে. আগে যে চুক্তি ছিল, তাতে কোরিয়ার রকেটের কার্যকর দূরত্ব তিনশ কিলোমিটারের বেশী হওয়ার কথা ছিল না. জানানো হয়েছে যে, এই চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনা করার দরকার সিওলের হয়েছে এই কারণে যে, যাতে রকেট গুলি দুই দেশের সীমান্তের থেকে দূরে উত্তর কোরিয়ার ভিতরে থাকা অস্ত্র ভাণ্ডারে প্রয়োজনে আঘাত করতে সক্ষম হয়.