রাষ্ট্রসঙ্ঘের জেনেভার মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত পরিষদের সভায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শ্রীলঙ্কা প্রশাসনের তরফ থেকে গৃহযুদ্ধের সময়ে মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করা সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত বর্তমানে একটা চূড়ান্ত পরিস্থিতি হওয়ার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে. এই প্রকল্প নিয়ে ভোট শেষ হবে আগামী শুক্রবারে.

    শ্রীলঙ্কার তরফ থেকে সমস্ত শক্তি দিয়ে এই প্রস্তাবকে প্রথমেই বাতিল করে দেওয়ার যে চেষ্টা করা হয়েছিল তার উপরে সোমবারে, এক গুরুতর আঘাত হানা হয়েছে. ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, বহু দিন ধরেই নিজের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট করে না বললেও, ঘোষণা করেছেন যে, ভারত সেই দিকেই ঝুঁকে পড়ছে, যাতে আমেরিকার প্রস্তাবকে সমর্থন করা যায়. এটা খুবই গুরুতর ভাবে ভারত ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের উপরে আঘাত হানতে পারে, তারই সঙ্গে এর ভারতীয় আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুতর পরিনাম ঘটাতে পারে.

    শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ সেখানের প্রশাসন ও “তামিল ইলম মুক্তি বাহিনীর টাইগারদের” মধ্যে ২৬ বছর ধরে যা চলেছিল – তা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের পাতায় যেমন একটি সবচেয়ে ট্র্যাজিক ঘটনা, আবার তা ভারতের জন্যও বটে. এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ দ্বীপের বাসিন্দা নিহত হয়েছেন – আর জঙ্গী এবং সরকারি ফৌজেরও লোক তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন, তেমনই আছেন সাধারন লোক.

    ভারতের জন্য, যাদের ফৌজ ১৯৮০ দশকের শেষে চেষ্টা করেছিল শান্তি প্রয়াসের, এই যুদ্ধ অনেক দামী হয়ে গিয়েছে: প্রায় ১৫০০ হাজার ভারতীয় সেনা নিজেদের জীবন দিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে “টাইগার” জঙ্গীদের হিংসার কবলে পড়েই. আর ১৯৯১ সালে এক সন্ত্রাসবাদী আত্মঘাতী মেয়ে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে হত্যা করেছিল এক বিস্ফোরণ দিয়ে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “যুদ্ধের সময়ে দুই পক্ষই তাঁদের দিক থেকে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছিল: সামরিক বাহিনী প্রায়ই কোন রকম বাদ বিচার না করেই তামিল গ্রামের উপরে বোমা বর্ষণ করেছিল, আর “টাইগাররা” খুবই সক্রিয় ভাবে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালু করেছিল. এই “টাইগার” জঙ্গীরাই ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ করেছিল, তারই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সেই উপায় বের করেছিল, যেমন আত্মঘাতী ব্যবহার করা. তাদেরই শিশুদের সামরিক কাজ কারবারে ব্যবহার করার জন্য খুবই ভিত্তি মূলক ভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে আর শান্তিপ্রিয় মানুষদের দিয়ে “জীবন্ত ঢাল” তৈরী করার জন্যেও, যখন সরকারি ফৌজ তাদের আক্রমণ করতে কোথাও গিয়েছে, তখন. কিন্তু তাও বিশ্ব সমাজের মতামতে সব সময়েই “খারাপ লোকজন” হয়েছে শ্রীলঙ্কার সরকার ও সরকারি ফৌজ. অনেক ক্ষেত্রেই এই কাজে সক্রিয় ভাবে সহায়তা করেছে যেমন প্রতিবেশী ভারতবর্ষের তামিল রাজনৈতিক নেতাদের প্রচার, তেমনই পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে যে বহুল পরিমানে তামিল প্রজাতির লোকজন রয়েছেন তাঁরাও”.

    সামরিক ভাবে বিরোধের অংশ হিসাবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার সরকার এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়া ও শান্তির উদ্দেশ্যে এক পরিষদ গঠন করেছিল. কিন্তু এটা কারও মনে হয়েছে যথেষ্ট নয়, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের সভার জন্য সিদ্ধান্তের খসড়া প্রস্তাব করেছে, যেখানে শ্রীলঙ্কার সরকারের কাছ থেকে খুবই কঠোর ভাবে দাবী করা হয়েছে এই সম্বন্ধে স্বাধীন তদন্ত করতে দেওয়ার. শ্রীলঙ্কার সরকার এই সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রথমতঃ দেখতে পাচ্ছে তাঁদের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা, আর দ্বিতীয়তঃ – এই বিরোধকে বাড়িয়ে তোলার প্রচেষ্টা. সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে পড়েছে ভারত, যারা নিজেরাই এই সন্ত্রাসবাদীদের কাজকর্মের ফলে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি, তাদের মধ্যে টাইগার দলের জঙ্গীরাও রয়েছে. এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “এখানে বড় একটি ভূমিকা দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় পালন করছে. কিছু আঞ্চলিক নির্বাচনের পরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার খুবই স্পষ্ট করে “ল্যাংড়া ঘোড়ায়” পরিণত হয়েছে, আর এমনকি সম্ভাবনা এসেছে সময়ের আগেই নির্বাচন হওয়ার. প্রধানমন্ত্রী এই সবে মাত্র তাঁর জোটের শরিক পশ্চিমবঙ্গের তৃণ মুল কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধকে শান্ত করতে পেরেছেন. আর এবারে প্রশ্ন তুলেছে আরও এক জোট শরিক ও বড় আঞ্চলিক দল তামিলনাডু রাজ্যের ডিএমকে দল – যারা বর্তমানে রাজ্যের ক্ষমতায় না থাকলেও কেন্দ্রে তাদের পক্ষ থেকে ১৮ জন লোকসভা সদস্য ও একজন মন্ত্রী রয়েছে”.

    সমস্ত রকমের ভাবে তীক্ষ্ণ হয়ে প্রশ্ন উঠেছে আবার নতুন করে জোট ভেঙে যাওয়ার, আর প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজন পড়েছে পিছিয়ে আসার. কারণ যখন সরকারের বেঁচে থাকার প্রশ্নই বাজী রাখতে হয়েছে, তখন সেই সব দুঃখ জনক ঐতিহাসিক বাস্তবকে (যেমন, রাজীব গান্ধী হত্যা) সম্ভবতঃ, মনে হয়, কিছু সময়ের জন্য ভুলে যাওয়া যেতে পারে.