এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বে প্রধান সংঘর্ষের কারণ হতে চলেছে জলের অভাব. এই রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন ষষ্ঠ বিশ্ব জল সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা. ২০৫০ সালে সারা পৃথিবীতে এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রসদের চাহিদা দেড় গুণ বাড়বে. আলাদা করে প্রত্যেকের জল পাওয়ার অধিকার কেউ  খণ্ডন করছেন না. রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারন সভায় এমনকি এটাকে মানুষের ভিত্তি মূলক অধিকার বলে মেনে নেওয়া হয়েছে. কিন্তু কিভাবে ও কে তা বজায় রাখবে – এই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা তা নিয়ে এবারেও কিছু স্পষ্ট করে বললেন না.

বিশ্ব জল সম্মেলন, যা মার্সেলে হয়ে গেল, তা এই বছরে জল সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য নিবেদিত ছিল. অংশগ্রহণকারীরা যে সংখ্যাতত্ত্ব দিয়েছেন, তাতে কোন রকমের আশাব্যঞ্জক চিত্র দেখতে পাওয়া গেল না. অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, সারা বিশ্ব জুড়ে মিস্টি জলের সঙ্কট আসছে. তার কারণ হল – উন্নতিশীল দেশ গুলির প্রয়োজন ও জলের উত্স গুলির কাছে যাওয়ার সমস্যা, সঞ্চয়ের অসমান বন্টন, এই কথা উল্লেখ করে “রেডিও রাশিয়াকে” পরিবেশ বিশেষজ্ঞ দানিলা বাদিউকোভ বলেছেন:

“প্রথমতঃ, জলের অভাব থেকে গরম দেশ গুলি বিষুব রেখার কাছের অঞ্চলে উত্তর আফ্রিকার সব গরীব দেশ গুলি কষ্ট পাচ্ছে. জলের অভাব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে মধ্য এশিয়াতেও. কারণ – মানুষের কাজকর্ম, অবশ্যই জলের ব্যবহারে অপচয় আর খুবই বেশী পরিমানে জল তুলে নেওয়া. যেমন, তুলোর ক্ষেতে জলের ব্যবহার. স্বাভাবিক কারণও রয়েছে – আবহাওয়ার উষ্ণায়ন. পাহাড়ের হিমবাহ গুলি গলে যাওয়ার ফলে নদীর অববাহিকা গুলি শুকিয়ে যাচ্ছে”.

একই সঙ্গে দ্রুত খারাপ হচ্ছে জলের গুণমান, আর তা পরিষ্কার করার গতি ও জলের পুনরায় সঞ্চয় হওয়ার পরিমান বেশী করেই পেছিয়ে পড়ছে. জলের উত্স গুলির দূষণ ঘটছে খুবই বিপজ্জনক ভাবে দ্রুত হারে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের রাসায়নিক ও ওষধির কারণে. ৫০ বছর আগেও সাধারণতঃ প্রাকৃতিক কারণেই জলের অভাব হত. এখন আবার বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, মানুষের কাজকর্মই আমাদের সেই বিপদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রায়ই এমনকি জলের সরবরাহ রয়েছে এমন জায়গাতেও তা ব্যবহার করতে পারা যাচ্ছে না খারাপ গুণমানের কারণে. পূর্বাভাস: ২০৫০ সালে পরিস্কার জলের চাহিদা দেড় গুণ বেড়ে যাবে. আর এটা শুধু আঞ্চলিক নয়, এমনকি বিশ্ব জোড়া সংর্ঘষের সামনে উপস্থিত করতে পারে. রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর সদস্য পদের প্রতিনিধি আলেক্সেই ইয়াবলকভ মনে করেন যে, পরিস্থিতি সঙ্গীণ হতে পারে তার অনেক আগেই, তাই তিনি বলেছেন:

“আগামী ১৫- ২৫ বছরের মধ্যেই জলের অভাব খুবই বেশী রকম হতে পারে. এটা বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক মহলে বোঝা সম্ভব হয়েছে. আজ এটা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা বিষয় হয়ে উঠেছে. যেমন বলা যেতে পারে নিকট প্রাচ্যের কিছু দেশে, ইজরায়েল ও তার প্রতিবেশী দেশ গুলির মধ্যে, কাজাখস্থান ও চিনের মধ্যে, মেকঙ্গ নদীর উপত্যাকায়. মিস্টি জলের অভাব – এটা কোন ভেবে বানানো বিষয় নয়, বরং গুরুতর সমস্যা, মানব সমাজকে যার সামনে উপস্থিত হতেই হবে”.

বর্তমানের বিশ্ব সম্মেলন হয়েছে “সিদ্ধান্তের সময়” নামে স্লোগান দিয়ে. কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয় নি. আন্তর্জাতিক জল প্রশাসন তৈরী করার প্রস্তাব বিশেষজ্ঞরা আপাততঃ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন না.

রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারন সভায় নেওয়া মানুষের জলের উত্সর উপরে অধিকার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এখানে বিতর্ক হয়েছে. এটা নেওয়া হয়েছিল ২০১০ সালে. কিন্তু কে ও কিভাবে এই অধিকার বজায় রাখবে – সরকার অথবা ব্যক্তি মালিকানা – তা আপাততঃ বুঝতে পারা যায় নি. যেমন, গ্রেট ব্রিটেনে পরীক্ষা করা হয়েছিল জলের পরিষেবাকে ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দিতে, কিন্তু সেখানে দেখা গিয়েছে তা জলের জন্য মাত্রাতিরিক্ত রকমের দামই শুধু বাড়িয়েছে. আর তার ফলে সরকারকে আবার সেই নিয়ন্ত্রণের কাজকর্ম নিজের হাতে নিতে হয়েছে. রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও অন্যান্য সংস্থারা যে কোন রকমের নীতিই ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু বর্তমানের সামাজিক উন্নতির স্তরে তা কার্যকরী করা অসম্ভব, এই রকম মনে করে আলেক্সেই ইয়াবলকভ বলেছেন:

“বিগত ২০ বছরে এক গুচ্ছ আন্তর্জাতিক সমঝোতা করা হয়েছে জল নিয়ে. তার মধ্যে সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া প্রবাহ ইত্যাদি নিয়েও করা হয়েছে. কিন্তু সেই সবই মানা হচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে সেই গুলি যথেষ্ট ফলপ্রসূ নয়. অর্থাত্ যেরকমই সমঝোতা করা হোক না কেন, যখন মানুষের পান করার উপযুক্ত কিছু থাকে না, যখন জলের উত্স নিয়ে স্রেফ লাঠালাঠি বেঁধে যায়, তখন কোন রকমের সমঝোতা বা ঘোষণা নিয়ে কারও মাথাব্যাথা থাকে না. সেই গুলির প্রতি মনে তো হয় না যে, কোন মনোযোগ দেওয়া হবে. কারণ এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সমঝোতার বাস্তবায়নের জন্য কোনও রকমের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি”.

বিগত মার্সেল সম্মেলনে রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রতিনিধিরা সমস্ত রকমের অভিযোগের সঙ্গেই একমত হয়েছেন. কিন্তু এখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ ফল পাওয়া সম্ভব হয়েছে: ১৯৯০ সালের তুলনায় পরিস্কার জলের কাছে যাদের যাওয়ার উপায় নেই, সেই ধরনের মানুষের সংখ্যা অর্ধেক করা সম্ভব হয়েছে. আর এর জন্য প্রধান শক্তি প্রয়োগ করেছে চিন, ভারত, ইন্দোনেশীয়া, রাশিয়া ও ব্রাজিল. শেষ দুটি দেশের কাছে আজ বিশ্বের সবচেয়ে বেশী মিস্টি জলের ভাণ্ডার রয়েছে.

0এখান যোগ করব যে, বিশ্ব জল সম্মেলন – এটাকে কখনও নাম দেওয়া হয়ে থাকে “জলের দাভোস সম্মেলন” – ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক জল সভার উদ্যোগে এটা করা শুরু হয়েছে. এই সম্মেলন প্রতি তিন বছরে একবার করে করা হয়