কয়েকদিন আগে লন্ডনের অর্থনীতির স্কুল এক বড় গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছে, যার নাম দিয়েছে: “ভারত পরবর্তী বৃহত্ শক্তি কি?”. এই প্রশ্ন উত্থাপন করে লেখকেরা ভারতের জন্য খুব একটা সন্তোষজনক উত্তর দেন নি: না, ভারত শুধু আজকেই কোন বৃহত্ শক্তি নয়, বরং, সম্ভবতঃ আসন্ন ভবিষ্যতে সে রকম হবেও না. আর এটাও ঠিক যে, এই লক্ষ্যে তাদের এগনোও উচিত্ হবে না.

    এই বইয়ের শিরোনামে এই যে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, তা অনেকটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টনের ২০০৯ সালের ভারত সফরের সময়ে করা ঘোষণার থেকেই উদ্ভূত. “ভারত শুধু আঞ্চলিকই নয়, বিশ্ব মানের রাষ্ট্র”, - ঘোষণা করেছিলেন শ্রীমতী ক্লিন্টন. এই লেখকরা ও তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক (তাঁদের মধ্যে ভারতীয়রাও রয়েছেন) বাস্তবে ঐকতানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিবের মতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন. সবচেয়ে তর্কের অবসর না রেখেই এটা করেছেন ভারতের বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ. তাঁর প্রবন্ধ, যা এই প্রবন্ধ গুচ্ছে প্রথমে দেওয়া হয়েছে, তা সবচেয়ে বেশী মন্তব্যের শিকার হয়েছে সারা বিশ্বের ও ভারতের সংবাদ মাধ্যমে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “প্রফেসর গুহ সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন, যার জন্য ভারত বৃহত্ শক্তি হতে পারবে না. এটা – নক্সালবাড়ী (মাওবাদী) আন্দোলনের নিরন্তর অভ্যুত্থান; দক্ষিণ পন্থী হিন্দু শক্তির হিংসা বিস্তার; একদা উদার ও সত্ কেন্দ্রীয় সরকারের অধঃপতন; ধনী ও দরিদ্র দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান; সংবাদ মাধ্যমের অভদ্র হয়ে যাওয়া; বর্তমানের মডেল অনুযায়ী দেশের সম্পদের ব্যবহার সংরক্ষণ, যা পরিবেশ সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে স্থিতিশীল উন্নয়নের পরিপন্থী; রাজনীতির অস্থিতিশীলতা ও পরম্পরার অভাব, যার কারণ এই যে, প্রশাসন গঠিত হচ্ছে বহু দলীয় ভিত্তিতে.

    অন্যান্য লেখকরা, সব মিলিয়ে তাঁদের সহকর্মীর সঙ্গে একমত. এই প্রবন্ধ গুচ্ছের ভূমিকায় নিকোলাস কিটচেন যেমন লিখেছেন যে, ভারতের প্রভাব বিশ্বে অনুভূত হবে সম্ভবতঃ ভারতের সাহিত্য, সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের জন্যই, ভারতের রন্ধনের ঐতিহ্য ও ক্রীড়াক্ষেত্রে উল্লেখ যোগ্য বিজয়ের জন্য, “কোন আন্তর্জাতিক বিষয়ে গঠন মূলক কাজের” জন্য নয়”.

    এখানে প্রশ্ন ওঠে: সুপার পাওয়ার বা বৃহত্ শক্তির মর্যাদা পাওয়ার মানে কি ও ভারতের এই স্থান পাওয়ার কোন মানে হয় কি? কার এতে স্বার্থ রয়েছে যে, ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন উচ্চ কোটির লোকদের চিন্তাকে প্রভাবিত করুক বৃহত্ শক্তি হওয়ার অনুপ্রেরণা? বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “আসলে, এর মূল দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে, আর লেখকরা শুধুশুধুই এই ক্ষেত্রে প্রথম ঘোষণা হিসাবে হিলারি ক্লিন্টনের নাম তোলেন নি. ভারতকে বিশ্বের বৃহত্ শক্তিতে পরিণত করার ধারণা প্রথমতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছিল, যারা ভারতকে চিনের ভূ- রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হিসাবে দেখতে চেয়েছে. বিশ্বের মঞ্চে নিজেদের প্রধান স্ট্র্যাটেজিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সরাসরি বিরোধে অবতীর্ণ হতে না চেয়ে (হতে পারে যে, ক্ষমতার অভাবে), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে “বকলমে বিরোধ” খাড়া করতে চাইছে বিশ্বের একেবারেই বিভিন্ন সব অঞ্চলে ও সমস্ত দিকেই. আর যদি তারা এই রাজনীতিতে ভারতকে সামিল করতে না পারে, তাহলে তারা এশিয়াতে নিজেদের সমস্যা অন্যের হাত দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করছে”.

    বাস্তবে আজকের ভারতের ক্ষমতা আসন্ন ভবিষ্যতে মনে তো হয় না যে, চিনের সত্যিকারের প্রতিপক্ষ হওয়ার মতো শক্তি যোগাবে. আর গবেষণা পত্র গুলি, যা লন্ডনের স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, তা মোটেও প্রথম নয়, যা এই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে. এক বছর আগে এই ধরনের গবেষণা আমেরিকার “রাণ্ড” কর্পোরেশনের বিশেষজ্ঞরা করেছিলেন, যারা ভারত ও চিনের উন্নয়নের ২০২৫ সাল পর্যন্ত পর্যালোচনা করে দেখেছেন ও সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, বর্তমানের দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান যা অর্থনৈতিক, বিজ্ঞান- প্রযুক্তি ও সামরিক ক্ষেত্রে রয়েছে, তা শুধু থাকবেই না, বরং বাড়তেও পারে.

    আর এটা সম্পূর্ণ ভাবেই সম্ভাব্য যে, বর্তমানের গবেষণার লেখকরা সঠিক, যখন তাঁরা লেখেন যে, ভারতের উচিত্ হবে দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার, ““ফোর্বস” তালিকায় নিজের দেশ থেকে শত ক্রোড়পতিদের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে অথবা দেশের যুযুধান অবস্থানে বোমারু বিমানের সংখ্যা কিংবা পারমানবিক বোমার শক্তির পরিমান বৃদ্ধি নিয়ে লক্ষ্য স্থির না করে”.