ভারতের পাঁতটি রাজ্যে – উত্তর-প্রদেশ, গোয়া, পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড ও মনিপুরে বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল একই সাথে প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত. এই নির্বাচনগুলিতে একটা অভিন্ন প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, সেটা হলো শাসক দলের বিরূদ্ধে ভোটদান. এটা আজই শুরু হয়নি, গত শরত্কালে একসারি রাজ্যে বিধানসভার ভোটে এই প্রবণতা খুব ভালো করেই লক্ষ্য করা গেছে. তাই সব রাজনৈতিক পক্ষই এই প্রবণতার সুযোগ নিতে চেয়েছিল. কিন্তু অনেকেরই এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি.

       আজ বিশ্লেষকরা যে মুখ্য প্রশ্নটা নিজেদের কাছে করছেন, তার সারমর্ম হচ্ছে, বিগত বিধানসভা নির্বাচনগুলির ফলাফল কেমনভাবে কেন্দ্রে ক্ষমতাশীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভাগ্যের উপর প্রভাব ফেলবে? পারবে কি কংগ্রেস পার্টি গত শরত্কালের এবং সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন থেকে পাওয়া আগাত সহ্য করে উঠতে? কেননা পার্টি গোয়ায় ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে তাদের নির্বাচনী ফলাফলের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি, উত্তরাখন্ডে কংগ্রেস তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দী ভারতীয় জনতা পার্টির সাথে সমানে সমানে টক্কর দিয়েছে. আর শুধুমাত্র সুদূরবর্তী মনিপুর রাজ্যেই নিরাপদ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পেরেছে.

    বাস্তবে, বিগত নির্বাচন প্রমাণ করলো, যে কেবলমাত্র দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য রাজনীতিবিদদের মরিয়া প্রচেষ্টা ও দেশের আগাগোড়া ছেয়ে যাওয়া দুর্নীতি এর কারণ নয়. যদিও অবশ্য এসবও ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে. নির্বাচন আরও প্রমাণ করলো, যে ভারতে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের নির্বাচনী বাস্তবতার আবির্ভাব হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিত্ব বা মতাদর্শের ততখানি ভূমিকা নেই, যতখানি আছে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য সব প্রকল্প, যা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সাহায্য করবে. এই প্রসঙ্গে বলছেন রুশী স্ট্র্যাটিজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি.

    ভোটের আগের দুই সপ্তাহ আমি গোয়ায় ছিলাম, যেখানে সাধারণ লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলার ও নিজের চোখে প্রাক-নির্বাচনী প্রচারের বিভিন্ন খুঁটিনাটি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল. আমাকে কয়েকটা ব্যাপার যত্পরোনাই বিস্মিত করেছে. প্রথমতঃ – আম জনতা দুর্নীতির প্রতি মোটামুটি সহনশীল, তারা একে জীবনের সাথী হিসাবে মেনে নিয়েছে. কারও এ ব্যাপারে কোনো মোহ নেই. রাজ্য সরকার যতই বদল হোক না কেন, শাসন ক্ষমতায় এসে নতুন লোকেরাও ঘুষ নেবে. তা নিক না, আসল কথা হল, তারা যেন জনসাধারণের জন্যেও কিছু করে.

      আর দ্বিতীয়তঃ – গোয়ার জনসংখ্যার মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশ ক্যাথলিক ধর্ম সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু আলাপকালে তাদের মধ্যে অধিকাংশই বলেছিল, যে তারা বিজেপিকে ভোট দেবে, বিজেপির বুকে সাম্প্রদায়িক হিন্দু দলের তকমা আঁটা থাকলেও. এর ব্যাখ্যা খুবই সরলঃ জনতার বিশ্বাস, যে ঐ পার্টি জনগণের স্বার্থে রাজ্যের উন্নতিকল্পে কিছু করবে. যদিও খুব কম লোকেরই মনে নতুন ক্ষমতাসীন পার্টি ও তার নেতৃবৃন্দের সততা ও কর্মকান্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো মোহ আছে.

       সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল উত্তর-প্রদেশ রাজ্যের প্রতি. ঐ রাজ্যে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিরোধীপক্ষের ভূমিকায় ছিল, আর সেইজন্য সাম্প্রতিক প্রবণতার পিঠে সওয়ার হয়ে বর্তমান শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার আশা করতেই পারতো. উপরন্তু – উত্তর-প্রদেশ ছিল বরাবর নেহেরু-গান্ধী সম্প্রদায়ের মজবুত ঘাঁটি, এবং নেহেরু-গান্ধী বংশের উত্তরাধিকারী রাহুল গান্ধী উত্তর-প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছেন. যদি তিনি ও তার দল সেখানে সফল হতো, তাহলে আশা করা যেতে পারতো, যে ২০১৪ সালের জন্য নির্দ্ধারিত নির্বাচনের আগেই রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হবেন.

 কিন্তু কংগ্রেস ও রাহুল উত্তর-প্রদেশে তাদের অবস্থানের উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা ২০০৭ সালের নির্বাচনের মতোই ৪র্থ স্থানে রয়ে গেছে. আর রাজনুতি বিশেষজ্ঞেরা রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অগ্রগমনে ইতি ও গোটা নেহেরু-গান্ধী সম্প্রদায়ের সূর্যাস্তের প্রসঙ্গে সরব হয়ে উঠেছেন.

      তবে এসব ব্যাপার নিয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ঠিক হবে না. রাহুলের বয়স সবেমাত্র ৪১ বছর, তাছাড়া এককালে নেহেরু-গান্ধী সম্প্রদায় কম পরাজয়ের সম্মুখীন হয়নি, কিন্তু প্রত্যেকবারই ভস্মস্তুপ থেকে জেগে উঠেছে.

     কিন্তু আগামীতে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত চটক এবং পারিবারিক যোগাযোগের  ওপর নির্ভর করে যে আর থাকা যাবে না, সেটা স্পষ্ট. এখন পার্টিগুলিকে এবং রাহুল সহ সব শীর্ষনেতাদের ভাবতে হব রাজনৈতিক খেলা ও জোর গলায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্পাবলী নিয়ে.