ভারতের বিরোধী পক্ষ আবারও প্রশাসনের সামনে অপ্রিয় প্রশ্নের অবতারণা করেছে. গত সপ্তাহের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর অতলান্তিক নেতৃত্বের প্রধান রবার্ট উইলার্ড মার্কিন কংগ্রেসে শুনানীর সময়ে এক জোরালো ঘোষণা করেছেন যে, ভারতে ও দক্ষিণ এশিয়ার আরও চারটি দেশ, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপে – আমেরিকার বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যারা এই দেশ গুলিকে সন্ত্রাস বিরোধী সংগ্রামে সহায়তা করবে.

    এই খবরে এক স্ক্যান্ডাল শুরু হয়েছে. বিরোধী পক্ষ প্রশাসনের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চেয়েছে. আর সেটাও দেওয়া হয়েছে. ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের তরফ থেকে ভারতে কোনও সামরিক বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করার প্রস্তাব যেমন দেওয়া হয় নি, তেমনই ভারতের সরকারও এই বিষয়ে কখনও কোন রকমের বিদেশী বাহিনী রাখার স্বীকৃতি দেয় নি. আর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেশে মার্কিন বিশেষ বাহিনী রাখার সংবাদকে বলা হয়েছে বাস্তবে সঠিক নয়. আমেরিকার পক্ষ থেকে কিন্তু অ্যাডমিরাল উইলার্ড যা বলেছেন তা ফিরিয়ে নেওয়ার কোনও প্রচেষ্টা করা হয় নি.

    প্রসঙ্গতঃ, এমনকি সরকারি ব্যাখ্যাতে কিন্তু ভারতীয় ও মার্কিন বিশেষ সামরিক বাহিনী যে বিভিন্ন সময়ে ভারতে নানা ধরনের সম্মিলিত মহড়া করে থাকে, সেই বিষয়ে নেতিবাচক কোনও উত্তর দেওয়া হয় নি.

    এই ধরনের ব্যাখ্যা দেশের বিরোধী পক্ষের পছন্দ হয় নি. এখানে প্রশ্নের উদয় হয়: আমেরিকার অ্যাডমিরালের ঘোষণার কেন এমন জোরালো প্রতিধ্বনি উঠেছে? কারণ সন্ত্রাস বিরোধী সংগ্রাম – এটা সব দেশেরই প্রশাসনের সামনে উপস্থিত প্রধান সমস্যা, আর ভারতের জন্য এই সমস্যা বিশেষ করে তীক্ষ্ণ. এই সংগ্রামের জন্য শক্তি একত্রিত কেনই বা করা হবে না? এখানে প্রয়োজন হল কয়েকটি বিষয় নিয়ে হিসাব করার, এই কথা বলেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি.

    “কিছু দিন আগের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশী করেই সন্ত্রাস বিরোধী সংগ্রামকে বিশ্বের বিভিন্ন বিন্দুতে নিজেদের প্রভাবকে মজবুত করার জন্য ব্যবহার করেছে- প্রায়ই তা করা হয়েছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাহ্য করেই, যাদের তারা নাকি সাহায্য করতে গিয়েছে. মনে করা যেতে পারে আফগানিস্তান মিশন, যা শুরুই হয়েছিল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বলে. সন্ত্রাসের সমস্যা তা সমাধান করে নি, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই দেশের নিয়ন্ত্রণ দখল করা সম্ভব হয়েছে, যা এশিয়ার প্রধান রাস্তা গুলির এক চৌমাথা.

    নিকট অতীতের উদাহরণ হিসাবে ওসামা বেন লাদেনকে পাকিস্তানে ধ্বংস করার মিশনের কথাও উঠতে পারে. বেন লাদেন সম্বন্ধে যত খুশী নেতিবাচক ভাবনা রাখাই যেতে পারে, তবে তাকে ধ্বংস করার মিশন হয়েছিল পাকিস্তানের সরকারের জন্য অজ্ঞাত অবস্থায়. আর তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ন্যায় সঙ্গত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল যে, তারা এমনকি নিজেদের সবচেয়ে নিকটবর্তী সহযোগীদের সার্বভৌমত্বের কোনও মূল্য দেয় না”.

    অ্যাডমিরাল উইলার্ড যে ঘোষণা করেছেন, তা আবার হয়েছে আর এক স্ক্যান্ডালের পটভূমিতে, ভারত সরকারের নতুন শক্তিশালী জাতীয় সন্ত্রাস বিরোধী কেন্দ্র খোলার প্রয়াস নিয়ে. এই কেন্দ্রের প্রয়োজন খুবই প্রসারিত ক্ষমতা ও দেশের সমস্ত অঞ্চলে এর কাজ করার অধিকার থাকছে, যা কোন ভাবেই স্থানীয় প্রশাসনের আওতায় পড়বে না.

    দেশের বহু বড় রাজ্যের প্রধানরা ইতিমধ্যেই এই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন. তাঁরা এই কেন্দ্র তৈরীর মধ্যে নিজেদের আঞ্চলিক ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ ও দেশের সংযুক্ত রাষ্ট্র কাঠামোয় হানি লক্ষ্য করেছেন. দেশের সরকার, যারা এখন খুব একটা ভাল সময় কাটাচ্ছেন না, তাঁরা আপাততঃ নিজেদের সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার বিষয়ে সময় পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন.

    আর এখনই স্পষ্ট হয়েছে যে, এই সন্ত্রাস বিরোধী সংগ্রামে শুধু রাজ্য গুলির আঞ্চলিক ক্ষমতাকেই খর্ব করা হয় নি, বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে. খুবই স্বাভাবিক যে, বিরোধী পক্ষ যারা এর মধ্যেই আগামী ২০১৪ সালের নির্বাচনে নিজেদের নিশ্চিত জয় দেখতে পাচ্ছে, তারা এই রকমের একটা সুযোগ কে রাজনৈতিক ভাবে হাত ছাড়া করতে চাইবে না.