হে আকাশ, অবগু্ন্ঠন খোলো! – মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহুর্তে বিশ্বে প্রথম নারী মহাকাশচারিনী ভালেন্তিনা তেরেশকোভা উচ্ছসিত হয়ে এই আহ্বাণ জানিয়েছিলেন. তিনি ‘ভস্তোক’ নামক মহাকাশযানের সওয়ারি হয়ে ১৯৬৩ সালের জুন মাসে তিন দিনের সফরের সময় ৪৮ বার পৃথিবী পরিক্রমা করেন. সোভিয়েত ইউনিয়নের বীরাঙ্গনার খেতাবধারী, বিশ্বের বহু দেশের সম্মানীয় নাগরিকের মর্য়াদায় অভিষিক্ত ও বর্তমানে সংসদের নিম্নকক্ষের সদস্যা ভালেন্তিনা তেরেশকোভার আজ ৬ই মার্চ ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হল.

     মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার আগে তিনি আপনজনেদের বলেছিলেন, যে প্যারাস্যুটারদের প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে যাচ্ছেন. তার আপনজনেরা বেতারে তার মহাকাশযাত্রা সম্পর্কে জানতে পারে. যাত্রার আগে তাকে দীর্ঘকালীন ও কঠোর পরিশ্রমসাধ্য প্রশিক্ষনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়. সেই আমলে প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া ছিল বাড়াবাড়ি রকমের কড়া. সবচেয়ে কঠিন ছিল এমনকি সেন্ট্রাফিউজে বিশাল ভার সহ্য করা নয়, বরং মনোস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা. সাতদিন ধরে বদ্ধ জায়গায়, সাদা রঙের একটি একেবারে শূন্য ঘরে কাটানো. আর তিনি সেখানে হাসতেন আর গান গাইতেন....

       মহাকাশচারীদের দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে তেরেশকোভা কারখানায় কাজ করতেন এবং প্যারাস্যুট থেকে ঝাঁপ দেওয়ার ক্রীড়া চর্চা করতেন ইয়ারোস্লাভলের এয়ার ক্লাবে. পড়াশোনা করেছেন পলিটেকনিক্যাল কলেজে. বিস্ময়কর ভাগ্য এই যশস্বী রুশী নারীর, যিনি তার চলার পথে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন. অ্যাভিয়েশন-স্পোর্টস স্কুল ও মহাকাশ যাত্রা. তারপর চূড়ান্ত খ্যাতির মাঝেও অটল থাকা, সামাজিক কর্মকান্ডের বিশাল চাপ বহন করা. এবং এই সমস্ত কিছু অসাধারণ সুন্দরী রুশী মহিলা ভালেন্তিনা তেরেশকোভা আত্মমর্যাদার সাথে বহন করছেন.

      যবনিকার আড়ালে ‘ভস্তোক-৬’ মহাকাশ যানটিকে টিনের কৌটো বলে নাম দেওয়া হতো. যানটি ছিল এতই ছোট্ট, যে তার ভেতরে শুধু অর্ধশায়িত অবস্থায় থাকা যেত. এবং তেরেশকোভাকে ঐরকম ভঙ্গীতে তিনদিন তিনরাত কাটাতে হয়েছে. তিনি স্মরণ করছেন, অটোমেটিক প্রোগ্র্যামেো কিছু ভুল ছিল.   

        “এই গোপন তথ্য আমি ৩০ বছর জনসমক্ষে জানাইনি. পৃথিবীপৃষ্ঠে অবতরন করা ও প্যারাস্যুট চালু করার পরিবর্তে, এমন প্রোগ্র্যাম সংযুক্ত করা হয়েছিল, যার দরুন কক্ষপথ আরও ওপরে উঠতে শুরু করেছিল এবং আমি ক্রমশঃই পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলাম”.

        এই ভুলটি তেরেশকোভা ঠিক সময়ে লক্ষ্য করেন ও উড়ান পরিচালনা কেন্দ্রকে তত্ক্ষনাত অবহিত করেন. সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পেয়ে তিনি নিজে প্রোগ্র্যামে কিছু রদবদল ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে ভূমিতে অবতরন করেন. মহাকাশ প্রযুক্তি সেই আমলে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নে, তেমনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল অত্যন্ত নবীন ও অনভিজ্ঞ, বলছেন ‘মহাকাশ বিজ্ঞানের খবর’ নামক পত্রিকার প্রতিবেদক ইগর লিসোভ. 

      সেই যুগে প্রতিটি মহাকাশযাত্রা ছিল বীরোচেত কীর্তি – যেমন আমাদের, তেমনই মার্কিনীদের. মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিক্রিয়া কিরকম হবে, সে সম্পর্কেও নির্দিষ্ট কোনো ধারনা ছিল না. তজ্জনিত সমস্যার উপসমের জন্যে ওষুধপত্রও ছিল না. সত্যিই মহাকাশযাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও বিপজ্জনক. সময় প্রমাণ করেছে, মানুষ হিসাবে সেই সময় বীরত্বপূর্ণ কীর্তি সম্পন্ন করা ভালেন্তিনা তেরেশকোভার অনুভূতির যথার্থতা.

     মহাকাশ যাত্রা সম্পন্ন করার পরে তেরেশকোভা ডিস্টিংশনের সঙ্গে সামরিক বিমান অ্যাকাডেমি খেকে পাশ করেন. অধ্যাপিকা, ৫০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক রচনার প্রণেতা – তিনি দীর্ঘকাল ধরে মহাকাশযাত্রীদের প্রস্তুতি কেন্দ্রে কাজ করেছেন, আন্তর্জাতিক স্তরে সামাজিক কর্মকান্ড নিয়ে কাজ করেছেন.

      ভালেন্তিনা তেরেশকোভা পৃথিবীতে একমাত্র নারী – যিনি একা মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন. তার পরবর্তীকালে অন্য সব মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে মিলে মহাকাশ যাত্রা করেছেন.